খেলার সঙ্গীই ঘাতক!

ছবি: আগামীর সময়
গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় শনিবার (২০ জুন) দুপুর পর্যন্ত সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। অন্যদিনের মতোই ছোট্ট আরিশা আক্তার খেলাধুলা করছিল আশপাশের শিশুদের সঙ্গে। পরিবারের কেউ তখন কল্পনাও করতে পারেননি, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তাদের জীবনে নেমে আসবে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।
আড়াই বছরের শিশু আরিশার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর ইসরাত জাহান শীম (১৪) নামের এক কিশোরী নিজেই কালীগঞ্জ থানায় গিয়ে শিশুটিকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুপুরে কালীগঞ্জ থানায় এসে শীম ডিউটি অফিসারের কাছে দাবি করে, “আমি শিশু আরিশাকে বালতির পানিতে চুবিয়ে মেরেছি, আমাকে হাজতে ভরেন।”
পুলিশ জানায়, ইসরাত জাহান শীম কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া এলাকার রাজপাড়া গ্রামের আবু কালামের মেয়ে। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
থানার ডিউটি অফিসার জোনাকি আক্তার কিশোরীর কাছে ঘটনার কারণ জানতে চাইলে শীম জানায়, তার মা ছোট্ট আরিশাকে বেশি আদর করতেন। এছাড়া শিশুটি বারবার তার কাছে বিস্কুট চাইছিল। তবে নিহত শিশু কিংবা তার পরিবারের সঙ্গে কোনো ধরনের শত্রুতা ছিল না বলেও দাবি করে সে।
শীমের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার সময় সে ঘরের ভেতরে ছিল। পরে বাইরে এসে টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিশাকে দেখতে পায়। সেখানে একটি বালতি ছিল। এরপর বালতিতে পানি ভরে শিশুটিকে পা ধরে উল্টো করে কয়েক মিনিট পানির মধ্যে চুবিয়ে রাখে বলে সে দাবি করেছে।
এদিকে আরিশার পরিবার জানায়, ঘটনার সময় শিশুটির মা ও বাবা ঘরে বসে পারিবারিক একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তারা। একপর্যায়ে টিউবওয়েলের পাশে রাখা পানিভর্তি একটি বালতির মধ্যে শিশুটিকে দেখতে পান। দ্রুত উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিশুটির মা বললেন, “আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম এটি হয়তো দুর্ঘটনা। পরে পুলিশ এসে জানায়, বাড়িওয়ালার মেয়ে থানায় গিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে।”
আরিশার বাবা আকাশ শেখ জানান, তিনি কিছু সময়ের জন্য কারখানায় গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন, তার মেয়ে ও বাড়িওয়ালার মেয়ে একসঙ্গে খেলছে। এমনকি ওই কিশোরী শিশুটিকে টোস্ট বিস্কুটও খেতে দিয়েছিল। পরে তিনি ঘরে চলে যান। প্রায় আধাঘণ্টা পর মেয়েকে আনতে গিয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বালতির ভেতর তার নিথর দেহ দেখতে পান।
নিহত আরিশা আক্তার রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাসিন্দা আকাশ শেখের মেয়ে। তার বাবা-মা কালীগঞ্জে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত এবং স্থানীয়ভাবে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. ইমরান হোসেন বললেন, দুপুর ১টার দিকে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পরে বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ হাসপাতাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বললেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্ত কিশোরীর বক্তব্যসহ সব বিষয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
একটি বিস্কুট, কিছুক্ষণ খেলাধুলা আর পরিবারের চোখের সামান্য আড়াল-এর মধ্যেই নিভে গেল একটি নিষ্পাপ প্রাণ। আরিশার মৃত্যুর রহস্য ও প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে এখন তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে তার পরিবারসহ পুরো কালীগঞ্জবাসী।




