ধর্মের সীমানা পেরিয়ে বন্ধুত্বের শেষ বিদায়

ছবি: আগামীর সময়
একজন মানুষকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে এসেছিলেন তিনি। চারপাশে তখন শোকাহত মানুষের ভিড়। কেউ কাঁদছেন স্বজন হারানোর বেদনায়, কেউ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিয়জনের শেষ বিদায়ের অপেক্ষায়। সেই ভিড়ের মধ্যেই চোখে পানি নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রদীপ সরকার। তবে তিনি এসেছেন স্বজন হিসেবে নয়, এসেছেন একজন প্রিয় বন্ধুর শেষ বিদায় দেখতে।
বন্ধুর নাম কামাল হোসেন বাবুল। ধর্ম আলাদা হলেও বন্ধুত্বে কোনোদিন দেয়াল তৈরি হয়নি তাদের মধ্যে। তাই বন্ধুর মৃত্যুর খবর পেয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি প্রদীপ।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) কচুয়া উপজেলার দহুলিয়া গ্রামে বাবুলের জানাজায় উপস্থিত হয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন জানাজার কাতারে।
প্রদীপ সরকারের বাড়ি উপজেলার দোয়াটি গ্রামে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে কামাল হোসেন বাবুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আত্মার বন্ধনের মতো। জীবনের নানা সময়ে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ভাগ করে নিয়েছেন তারা। সেই প্রিয় মানুষটিই যখন না-ফেরার দেশে চলে গেলেন, তখন ধর্মীয় পরিচয় নয়, বন্ধুত্বের টানেই ছুটে আসেন প্রদীপ।
বাবুলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ভেঙে পড়েন তিনি। বুধবার রাত ১১টার দিকে অসুস্থতাজনিত কারণে ৫৫ বছর বয়সে মারা যান কামাল হোসেন বাবুল। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।
বৃহস্পতিবার জানাজার সময় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ছাড়াও বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু শোকের সেই পরিবেশে আলাদাভাবে চোখে পড়ে প্রদীপ সরকারের উপস্থিতি। সনাতন ধর্মাবলম্বী হয়েও মুসলিম বন্ধুর জানাজায় তার অংশগ্রহণ উপস্থিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
জানাজার আগে বন্ধুর মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন প্রদীপ। কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
প্রদীপ সরকার বলেন, ধর্ম আমাদের আলাদা হতে পারে, কিন্তু বন্ধুত্বের কোনো ধর্ম নেই। বাবুল আমার শুধু বন্ধু ছিল না, সে ছিল আমার আপনজনের মতো। ওর সঙ্গে কত স্মৃতি, কত কথা সবকিছু আজ চোখের সামনে ভাসছে। ভাবতেই পারছি না, বাবুল আর আমাদের মাঝে নেই।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ভারী কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, বন্ধুকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছি। আমি জানি, ও আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কিন্তু ওর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো কোনোদিন ভুলতে পারব না। বাবুল আমার হৃদয়ে সারাজীবন বেঁচে থাকবে।
প্রদীপের কথা শুনে সেখানে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কারও চোখে পানি, কারও মুখে ছিল নীরবতা। কারণ ওই মুহূর্তে ধর্মের পরিচয় যেন হারিয়ে গিয়েছিল মানবিকতার কাছে।
জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে প্রদীপ যেন ফিরে যাচ্ছিলেন পুরোনো দিনগুলোর কাছে। বন্ধুর সঙ্গে কাটানো আনন্দের মুহূর্তগুলো হয়তো একে একে মনে পড়ছিল। অথচ আজ সেই বন্ধুকেই শেষবারের মতো বিদায় জানাতে হয়েছে।
বাবুলের পরিবার ও স্বজনদের পাশাপাশি বন্ধুরাও হারিয়েছেন একজন আপন মানুষ। আর প্রদীপ সরকারের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতি হয়ে থাকল সেই বন্ধুত্বের এক অনন্য সাক্ষ্য।







