বাধা উপেক্ষা করে দিরাইয়ে বসল বাউল গানের আসর, গাইলেন নারী শিল্পীরাও

বাউল আসরে গান গাইছেন স্থানীয় এক শিল্পী। ছবি: আগামীর সময়
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে নিজ বাড়িতে বাউল গানের আসরের আয়োজন করেছিলেন এক প্রবাসী। কিন্তু স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তি ও প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগের পর বেকায়দায় পড়েছিলেন আয়োজক। তিনি একপর্যায়ে পুলিশকে জানিয়েছিলেন অনুষ্ঠান করবেন না। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি গানের অনুষ্ঠান করেছেন এবং সেই আসরে একাধিক নারী শিল্পী গান পরিবেশন করেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতভর আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ দর্শক-শ্রোতাও ছিলেন। উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলীর বাড়িতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
এর আগে শওকত আলী জানিয়েছেন, তার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ছোট পরিসরে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। নারী শিল্পীদের গান পরিবেশনের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। এ ঘটনায় গ্রামবাসীর পক্ষে আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু গত বুধবার দিরাই থানার ওসি বরাবর লিখিত আবেদন করেন। তারা অভিযোগ জানান, নারী বাউলদের গান পরিবেশনকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ও
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
অভিযোগকারী কামরুল জানিয়েছেন, তাদের গ্রামের ধর্মীয় পরিবেশ ও ইসলামি মূল্যবোধের কথা বিবেচনা করে তারা অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা, মসজিদ ও একাধিক কবরস্থান রয়েছে। নারী শিল্পীদের গানকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা অন্য কেউ আপত্তি জানালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করেছিলেন।
গানের অনুষ্ঠান বন্ধের এ সংবাদ জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
কামরুল বলেছেন, ‘পুলিশ ও আয়োজকদের মধ্যে আলোচনা হওয়ার পর অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গানের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার হতে দেখে তারা আবারও ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান।
অনুষ্ঠান বন্ধের চক্রান্ত ও অপপ্রচারে ক্ষোভ প্রকাশ করে আয়োজক শওকত অনুষ্ঠান চলাকালীন ফেসবুক লাইভে বলেছেন, ‘সমাজে ভালো মানুষের পাশাপাশি কিছু খারাপ মানুষও থাকে। আমি আমার দাদার ওরস মোবারক পালনের উদ্দেশে এখানে এসেছিলাম। অথচ কিছু লোক অপপ্রচার চালিয়ে বলেছে যে আমি নাকি এখানে যাত্রা কিংবা ঘাটুগানের আসর বসিয়েছি। সবাই দেখেছেন আমি কি কাজ করেছি।’
‘অন্যপক্ষের উদ্দেশে নতুন করে কিছু বলার নেই’ উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘তারা যদি সৎ সাহস রাখে, তবে যেন সামনে এসে কথা বলে। স্থানীয় প্রশাসনকেও ধন্যবাদ জানাই। আমি কোনো অনৈতিক কাজ বা জুয়ার আসর করতে আসিনি, দাদার ওরসের কাজেই এসেছিলাম।’
‘যারা এটা (অনুষ্ঠান) পণ্ড করার চক্রান্ত করেছিল, তারা দেখুক আমি শেষ পর্যন্ত কী করেছি,’ যোগ করলেন শওকত। বক্তব্যের শেষে তিনি একটি গানও পরিবেশন করেন।
দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জানিয়েছিলেন, গানের আয়োজন নিয়ে আপত্তি ওঠার পর আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ। পরে আয়োজকরা গান-বাজনা করবেন না বলে আশ্বস্ত করায় অভিযোগের বিষয়টি মীমাংসা হয়েছিল।
গতকাল শুক্রবার ওসি আমিনুল বলেছেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে ওই গ্রামে প্রবাসীর বাড়িতে গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে জানাতে ২-৩ জন ব্যক্তি থানায় এসেছিলেন। আমি উনাদের বসিয়ে রেখে যে ফেসবুক আইডি থেকে গানের লাইভ হচ্ছিল, সেটি দেখলাম। তারপর উনাদের জানালাম, ওখানেতো অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। কোনো অশ্লীলতাওতো নেই। গ্রামের আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম, তারাও অনুষ্ঠানে কোনো অশ্লীলতা হয়নি বলে জানালেন। শান্তিপূর্ণভাবেই গানের আসর হয়েছে।’
হাতিয়া গ্রামের পাশের তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামেই প্রয়াত বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের বাড়ি।
দিরাইয়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আপত্তির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় একটি পক্ষের বিরোধিতায় দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থগিত করা হয়। দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের নারী খেলোয়াড়দের মধ্যে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ওই ম্যাচের বিরোধিতাকারীদের পক্ষ থেকে নারীদের মাঠে খেলাধুলা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
আয়োজকদের বক্তব্য ছিল, মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতেই ম্যাচটির আয়োজন করা হয়েছিল।






