বর্ষায় কম খরচে বাড়ছে পর্যটকের ভিড়

কক্সবাজারে পর্যটকরা— আগামীর সময়
ঘোর বর্ষায় বদলে গেছে কক্সবাজারের চিরচেনা পর্যটনচিত্র। কালো মেঘ, টানা বৃষ্টি, উত্তাল সমুদ্র আর সৈকতজুড়ে ঢেউয়ের গর্জন। সব মিলিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত ধারণ করেছে অন্যরকম এক রূপ। একসময় বর্ষাকাল মানেই ছিল পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘ ‘অফ সিজন’। পর্যটক কমে যেত, হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের কক্ষ পড়ে থাকত খালি। কিন্তু সেই চিত্র এখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
বৃষ্টিস্নাত সৈকত, মেঘলা আকাশ আর উত্তাল সাগরের ভিন্ন সৌন্দর্য দেখতে এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজারে ছুটে আসছেন পর্যটক। সরকারি ছুটি বা উৎসব না থাকলেও প্রতিদিনই কমবেশি পর্যটকের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সৈকত ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রে তৈরি হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের ভ্রমণ-অভ্যাস বদলানোর পাশাপাশি রেল, সড়ক ও আকাশপথে যোগাযোগ সহজ হওয়া এবং হোটেল-রিসোর্টে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার কারণে বর্ষাতেও কক্সবাজারে পর্যটকের আগ্রহ বাড়ছে।
ছুটির দিনে মুখর সৈকত
চলতি বর্ষায় সবচেয়ে বেশি পর্যটকের সমাগম দেখা গেছে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দিবসের সরকারি ছুটিকে কেন্দ্র করে। ওই ছুটির পর শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে কয়েক দিন পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সমুদ্রনগরী। এছাড়া প্রতি সপ্তাহিক ছুটিতে পর্যটকে পূর্ণ থাকছে কক্সবাজার।
লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের পাশাপাশি হিমছড়ি, ইনানী, পেঁচারদ্বীপ ও মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন এলাকায় গত শুক্রবারও ছিল পর্যটকদের চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি। কেউ বৃষ্টিতে ভিজে সৈকতে ঘুরেছেন, কেউ দূর থেকে উপভোগ করেছেন উত্তাল ঢেউ। মেঘলা আকাশের নিচে ছবি তুলতেও দেখা গেছে অসংখ্য ভ্রমণপিপাসুকে।
তবে শুধু ছুটির দিনেই নয়, সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতেও পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বর্ষাকালে ব্যবসা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো, তা অনেকটাই কমেছে।
রেলপথ খুলেছে নতুন সম্ভাবনা
কক্সবাজারে পর্যটক বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে রেল যোগাযোগকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ও আন্তর্জাতিক মানের আইকনিক কক্সবাজার রেলস্টেশন উদ্বোধনের পর পর্যটকদের যাতায়াতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রবাল এক্সপ্রেস ও সৈকত এক্সপ্রেস চলাচল করছে। ফলে পরিবার ও দলবদ্ধ পর্যটকদের কাছে ট্রেন ক্রমেই আকর্ষণীয় যাতায়াতমাধ্যম হয়ে উঠছে।
কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. জয়নাল আবেদীন বলেছেন, বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল করছে। যাত্রীদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে এ রুটে ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তার মতে, রেল যোগাযোগ চালুর পর কক্সবাজারে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীদের কাছে ট্রেন এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
অর্ধেকের বেশি ছাড়ের সুযোগ
বর্ষার পর্যটক টানতে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে চলছে নানা ধরনের অফার। অনেক তারকা মানের হোটেলে কক্ষ, খাবার ও অন্যান্য সেবায় দেওয়া হচ্ছে বড় ধরনের ছাড়। কোথাও কোথাও ৫০ শতাংশেরও বেশি ছাড় মিলছে।
শীত মৌসুমে যে কক্ষের ভাড়া তুলনামূলক বেশি থাকে, বর্ষায় সেই কক্ষ কম খরচে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে স্বল্প বাজেটে কক্সবাজার ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন পর্যটকেরা।
তারকা মানের হোটেল সায়মান বিচ রিসোর্টের ফিন্যান্সিয়াল কন্ট্রোলার আসাদুজ্জামান নূর বললেন, ‘গত তিন বছর ধরে বর্ষাকালে পর্যটনের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।’
তার ভাষ্য, আগে মানুষের ধারণা ছিল শীতকালেই ঘুরতে যেতে হবে। এখন সেই চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। মানুষ সারা বছরই ভ্রমণ করতে চায় এবং বিভিন্ন ঋতুতে একই পর্যটনকেন্দ্রের ভিন্ন সৌন্দর্য উপভোগ করতে আগ্রহী।
আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘বর্ষাকে কেন্দ্র করে তাদের হোটেলে কক্ষ ও অন্যান্য সেবায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে। গত বছরের মতো এবারও বর্ষা মৌসুমে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।’
পেঁচারদ্বীপেও বাড়ছে আগ্রহ
মেরিন ড্রাইভের রামুর পেঁচারদ্বীপ এলাকার মারমেইড বিচ রিসোর্টেও বর্ষায় পর্যটকদের ভালো সাড়া মিলছে।
রিসোর্টটির ম্যানেজার রানা কর্মকার বলেছেন, ‘মাসের শুরুতে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছিল। পরে তা কমিয়ে ৫০ শতাংশ এবং বর্তমানে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।’
তার ভাষ্য, বর্ষায় কক্সবাজারের ভিন্ন রূপ দেখতে পর্যটকেরা রিসোর্টে আসছেন। অনেক সময় কক্ষ আগাম বুকিংও হয়ে যাচ্ছে।
রানা কর্মকার বললেন, ‘বর্ষায় দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে অনেক পর্যটক তুলনামূলক সহজ যোগাযোগের গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারকে বেছে নিচ্ছেন।’
বদলাচ্ছে ‘অফ সিজন’ ধারণা
তারকা মানের আরেক হোটেল ওশান প্যারাডাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা সায়ীদ আলমগীরের ভাষ্য, আগে বর্ষাকালকে কক্সবাজারের পর্যটনের ‘অফ সিজন’ বলা হতো। কিন্তু দিন দিন সেই ধারণা বদলাচ্ছে।
তিনি জানালেন, এখন বর্ষাতেও পর্যটকদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাদের হোটেল নয়, কক্সবাজারের বিভিন্ন তারকা মানের হোটেলেও বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তাদের হোটেলে ছুটির দিনগুলোতে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ এবং অন্যান্য দিনে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় রয়েছে।
পর্যটকদের চোখে অন্যরকম কক্সবাজার
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটক বেলাল উদ্দিন বললেন, ‘বর্ষায় কক্সবাজারে আসার ইচ্ছা অনেক দিনের। বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ আর বড় ঢেউয়ে সৈকতকে অন্যরকম লাগে। তার ওপর হোটেল ভাড়াও তুলনামূলক কম।’
চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আসা সারিক আহমেদ বলেছেন, ‘শীতকালে কক্সবাজারে ভিড় বেশি থাকে এবং হোটেলের ভাড়াও বেড়ে যায়। বর্ষায় তুলনামূলক কম খরচে ঘোরা যায়। তবে উত্তাল সমুদ্রে নামার ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
খুলনা থেকে আসা অন্তরা বিশ্বাস বলেছেন, ‘বর্ষায় কক্সবাজারের প্রকৃতি আরও জীবন্ত মনে হয়। আকাশে মেঘ, মাঝেমধ্যে বৃষ্টি আর সামনে বিশাল সমুদ্র। সব মিলিয়ে এটি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা।’
বিনিয়োগের তুলনায় পর্যটক এখনো কম
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘ইতিবাচক দিক হলো দিন দিন দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। এখন প্রয়োজন বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া ‘
তার মতে, কক্সবাজারের পর্যটনকে শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে পারলে এই খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
উত্তাল সমুদ্রে বাড়তি সতর্কতা
বর্ষায় কক্সবাজারের সৌন্দর্য যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তেমনি উত্তাল সমুদ্র হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক। নিম্নচাপ ও অতিবৃষ্টির প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকলে গোসলে নামার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন।
সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালনকারী সি সেইফ লাইফগার্ডের ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ সতর্ক করলেন, বর্ষায় সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা গেলেও পানিতে নামার ক্ষেত্রে লাইফগার্ডদের নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে।
তার ভাষ্য, লাল পতাকা টাঙানো থাকলে কোনোভাবেই পানিতে নামা উচিত নয়। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করে পর্যটকদের গোসলের পরামর্শ দেওয়া হয়।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, সব মিলিয়ে কয়েক বছর আগের কক্সবাজারের বর্ষাকালীন পর্যটনচিত্র এখন আর আগের মতো নেই। একসময় যে মৌসুমকে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ খরার সময় হিসেবে দেখতেন, সেই বর্ষাই এখন নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।
তার ভাষ্য, বৃষ্টিভেজা সৈকত, মেঘলা আকাশ, উত্তাল ঢেউ, মেরিন ড্রাইভের সবুজ পাহাড় আর সাগরের মিলনে বর্ষার কক্সবাজার প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য হয়ে উঠছে ভিন্ন এক গন্তব্য।
যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করা, পর্যটনকেন্দ্রের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা জোরদার এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে কক্সবাজার শুধু শীতের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকবে না। বছরের ১২ মাসই সমুদ্রনগরী পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকবে বলে মত দেন তিনি।









