ঈশ্বরদীতে বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প

ছবি: আগামীর সময়
পাবনার ঈশ্বরদীতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। আধুনিক তৈজসপত্রের ব্যবহার বাড়ায় মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে মাটি ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পাল সম্প্রদায়ের মানুষ। অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন।
সরেজমিন জানা গেছে, উপজেলার মুলাডুলি ও সাঁড়া ইউনিয়নের আরামবাড়িয়ায় একসময় প্রায় তিন শতাধিক পাল পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পালপাড়ায় আগে সারি সারি মাটির তৈজসপত্র দেখা গেলেও এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে শতাধিক পরিবার কোনোভাবে এ পেশা ধরে রেখেছে। এসব কাজে পরিবারের নারী ও শিশুরাও পুরুষদের সহযোগিতা করছেন।
একসময় পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজে মাটির তৈজসপত্রের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। মৃৎশিল্পীরা মাটি, বালি, পানি, খড় ও লাকড়ি দিয়ে দইয়ের হাঁড়ি, পিঠাখোলা, ভাতের পাতিল, পাতিলের ঢাকনা, তরকারির কড়াই, রসের হাঁড়ি, ধূপ জ্বালানোর পাত্র, মুড়ির পাতিল, বাতি জ্বালানোর পাত্র ও শিশুদের খেলনাসহ নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি করতেন।
কালের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, মেলামাইন, স্টিল ও সিলভারের তৈরি বাহারি ডিজাইনের তৈজসপত্রের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে মাটির জিনিসের চাহিদা কমেছে। এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় মাটির সংকট ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি মাটির তৈরি পণ্যের দাম। এতে আয় কমে যাওয়ায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
মৃৎশিল্পী নরেন চন্দ্র পাল জানালেন, বাবা-মাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই তিনি মাটির কাজ শিখেছেন। একসময় মাটির তৈরি জিনিসের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন দইয়ের হাঁড়ি ও টয়লেটের পাট ছাড়া অন্য তৈজসপত্রের তেমন চাহিদা নেই। ফলে সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মৃৎশিল্পী মহাদেব কুমার জানান, একসময় আশপাশের বিভিন্ন জমি থেকে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে এক গাড়ি মাটি কিনতে পারতেন। এখন ইটভাটা বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ মাটি কিনতে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। পাশাপাশি লাকড়ি ও খড়ির দামও বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও মাটির তৈজসপত্রের দাম তেমন বাড়েনি। ফলে আগের মতো লাভ হচ্ছে না।
নারী মৃৎশিল্পী সাবিত্রী রানী পাল জানিয়েছেন, একসময় হাঁড়িপাতিল ও শিশুদের খেলনাসহ ৪০ থেকে ৫০ ধরনের পণ্য তৈরি হতো। এখন মাত্র ৮ থেকে ১০ ধরনের জিনিস তৈরি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে কিছুটা চাহিদা থাকলেও বর্ষাকালে অধিকাংশ সময় কাজ থাকে না।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা। প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে নতুন প্রজন্মকেও এ পেশায় ধরে রাখা যাবে বলেও জানান তারা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব জানিয়েছেন, মৃৎশিল্পীদের জন্য সরাসরি সরকারি সহযোগিতার সুযোগ নেই। তবে বিভিন্ন সমিতি ও যুব উন্নয়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার সুযোগ রয়েছে।




