‘গাছপাগল’ রাজ্জাক

মিজানুর রহমান রাজ্জাক
সারি সারি গাছ। ফলদ, বনজ কিংবা ঔষধি। এসব কাছে বিভিন্ন মৌসুমে ফুল-ফল ধরে। ফল পাকলে কারও অনুমতি ছাড়াই যে যার মতো পেড়ে খেতে পারেন। আবার সেই ফুল-ফলের লোভে গাছে ভিড় করে নানা জাতের পাখি।
এসব গাছ লাগানো হয়েছে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে। না, কোনো সরকারি প্রকল্পের আওতায় লাগানো হয়নি সেগুলো। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ছাত্রাবস্থা থেকে সেগুলো রোপণ শুরু করেছিলেন উপজেলার সিন্দুর্না গ্রামের মিজানুর রহমান রাজ্জাক। প্রায় দুই দশক আগে তার হাতে লাগানো গাছগুলো এখন পরিণত। তিনি শুধু নিজের উপজেলাতেই গাছ লাগাননি। তা ছড়িয়ে দিয়েছেন জেলার অন্যান্য উপজেলাসহ পাশের জেলা নীলফামারীতেও। প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি নিখাদ এ ভালোবাসার কারণে তাকে এখন সবাই ডাকেন ‘গাছপাগল রাজ্জাক’ নামে।
সেই ২০০৬ সালে বিভিন্ন সড়কের পাশে গাছের চারা রোপণ শুরু করেন তিনি। এ কাজ চালিয়েছেন অন্তত দুই দশক। নিজের হাতে যেমন গাছ লাগিয়েছেন, তেমনি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষের হাতেও রোপণের জন্য বিনামূল্যে তুলে দিয়েছেন বিভিন্ন জাতের চারা। সবমিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে বলে দাবি রাজ্জাকের।
নিজের বাড়িতে সাত শতক জমিতে তার ‘সবুজ পৃথিবী বাঁচাও’ নামে একটি নার্সারি আছে। তিনি ২০০৬ সাল থেকে হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না, সিঙ্গিমারী, টংভাঙ্গা, পাটিকাপাড়া, ভেলাগুড়ি, গোতামারী ও গড্ডিমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে চারা রোপণ করেছেন। এর বাইরে পাশের উপজেলা পাটগ্রামের আলোচিত ‘ছিটমহল’ দহগ্রাম–আঙ্গরপোতা ও কালীগঞ্জ উপজেলার দহগ্রামেও লাগিয়েছিলেন গাছ। এ ছাড়া নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চাপানি ইউনিয়নেও রোপণ করেছিলেন চারা। এসব এলাকার বিভিন্ন রাস্তা, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চত্বর এবং হাটবাজারে চারাগুলো রোপণ করেছিলেন রাজ্জাক। যা আজ বড় বড় গাছে পরিণত হয়েছে।
স্নাতক শেষ করে গাছপাগল কৃষি কাজকেই বেছে নিয়েছেন। এখন তিনি পুরোদস্তুর একজন কৃষক। দুই সন্তানের জনক এ মানুষটিকে চারা রোপণ-বিতরণে কখনও বাধা দেননি স্কুলশিক্ষক স্ত্রী জিন্নাত রোকসানা জ্যোতি। সবসময় এ কাজে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন বাবা নুরুল হক।
মিজানুর রহমান রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলেজে পড়ার সময়ই গাছ লাগানোর নেশায় পড়েন তিনি। ফলে কখনও টিউশনির টাকা জমিয়ে, কখনও বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি করে সেই টাকা জমিয়ে গাছের চারা কিনে রোপণ করেছিলেন। মাঝেমধ্যে বাবার কাছেও টাকা নিয়ে চারা কিনতেন। এমনকি একসময় ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণও নিতে হয়েছিল।এ কাজ দেখে বিভিন্ন সময় স্বজনরাও গাছের চারা দিয়ে তাকে সহায়তা করেছিলেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হাতীবান্ধা হাটখোলা থেকে তমের চৌপতি পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য গাছ। রয়েছে আম, কাঠালসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ। যেগুলো এখন ফুল-ফল দিচ্ছে। সবগুলো গাছেই রাজ্জাকের লাগানো। সিন্দুর্না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আরিফুল ইসলামের বাড়ি থেকে ধুবনী মোড় পর্যন্তও রয়েছে তার (রাজ্জাক) লাগানো সারি সারি গাছ।
গাছ লাগানোর দিকে ঝুঁকেছিলেন কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে বেশি বেশি গাছ লাগানো দরকার। এটি যেমন সরকারের দায়িত্ব তেমনি প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব থেকেই আমি এ কাজ করেছি। এখন আমার লাগানো চারাগুলো বড় বড় গাছ হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সেই গাছগুলো দেখে অনেক ভালো লাগে।’
রাজ্জাকের স্ত্রী জিন্নাত রোকসানা জ্যোতি বলেন, ‘গাছের ব্যাপারে আমার স্বামী পাগল। এটা অনেক ভালো কাজ। আমিও এটি উপভোগ করি।’
কলেজশিক্ষক নাজমুল কায়েস হিরু বলেন, ‘গাছ লাগাতে গিয়ে টাকার দিকে কখনও তাকায়নি রাজ্জাক। আমি নিজেও তার ‘সবুজ পৃথিবী বাঁচাও’ আন্দোলনের সঙ্গে আমিও জড়িত থেকে যতটা সম্ভব সহায়তা করেছি। তবে সে এত বড় একটা কাজ করেও আজ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। এটা পাওয়া তার অধিকার।’




