বিরল ঝুমকোলতা
ফুলটি দেখতে দুলের মতো

ঝুমকো লতা ফুল
ফুলটি দেখতে দুলের মতো। নীল, সাদা ও হালকা ক্রিম রঙের অপূর্ব সমন্বয়ে ফুটে থাকা এই ফুল সহজেই যে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। লতানো গাছের মনোমুগ্ধকর এ ফুলটির নাম ঝুমকো লতা ফুল বা প্যাশন ফ্লাওয়ার।
বর্তমানে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার শ্যামলী আবাসিক এলাকার জননী নার্সারিতে ফুটে থাকা এই দৃষ্টিনন্দন ফুল দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।
ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলে বেড়ে ওঠা এ লতানো উদ্ভিদটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও এটি ঝুমকো জবা, কোথাও শঙ্খচক্র, রাধিকা নাচন, পঞ্চপান্ডব, কৃষ্ণকমল, রাখী ফুল কিংবা বেগম বাহার নামে পরিচিত। ফুলটির ইংরেজি নাম Passion Flower এবং বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora incarnata। বিশ্বজুড়ে এ ফুলের প্রায় অর্ধশতাধিক প্রজাতি রয়েছে।
শুধু সৌন্দর্যেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গাছটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ফুল ঝরে যাওয়ার পর এতে গোলাকার ফল ধরে, যা প্যাশন ফ্রুট বা স্থানীয়ভাবে ট্যাং ফল নামে পরিচিত। অম্ল স্বাদের এ ফল শরবত তৈরিতে জনপ্রিয়। ফল পাকলে কমলা-লাল বর্ণ ধারণ করে এবং তা দিয়ে আচারও তৈরি করা হয়। পর্যটন এলাকাগুলোতে এর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে।
ফুল দেখতে আসা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান ইমা বলেন, আগে আমি কখনো এই ফুল দেখিনি। আজ বন্ধুদের সঙ্গে দেখতে এসেছি। ফুলটি দেখতে অনেকটা নারীদের কানের দুলের মতো। সত্যিই খুব সুন্দর ও আকর্ষণীয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল মিয়া বললেন, সিলেটের একটি রিসোর্টে অন্য ধরনের ঝুমকো ফুল দেখেছিলাম। তবে জননী নার্সারির এই ফুলের শুভ্র সাদা রঙ ও নকশা সত্যিই অসাধারণ। ফুলটি দেখে আমি এবং আমার পরিবার মুগ্ধ।
জননী নার্সারির সত্ত্বাধিকারী মো. আল আমিন জানান, ২০২৩ সালে যশোরের একটি চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সাথী নার্সারি থেকে তিনি প্যাশন ফ্রুটের বীজ সংগ্রহ করেন। পরে সেই বীজ থেকে চারা উৎপাদন করে রোপণ করেন। প্রায় এক বছর পর ২০২৪ সালে গাছে প্রথম ফুল ফোটে। এরপর ধীরে ধীরে ফল ধরতে শুরু করে। গত বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল পাওয়া যায়। চলতি বছরও গাছজুড়ে ফুল ও ফলে ভরে গেছে। ফলে প্রতিদিনই অনেক মানুষ ফুল দেখতে তার নার্সারিতে আসছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, এটি সারা বছরই চাষ করা যায় এবং লাভজনক একটি ফসল। আমি চারা বিক্রির পাশাপাশি ফলও বাজারজাত করি। গাছে প্রায় সারা বছরই ফুল ফোটে। প্রতিটি পাতার গোড়া থেকে একটি করে ফুল বের হয়, যা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর।
তিনি আরও জানান, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ফুল ফোটার পর আষাঢ় থেকে ভাদ্র পর্যন্ত গাছে ট্যাং ফল ধরে। পাকা ফল সংগ্রহ করে শরবতসহ বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়।
স্থানীয়দের মতে, প্যাশন ফ্লাওয়ার বাংলাদেশে খুব বেশি দেখা যায় না। তাই ফুল ও ফল দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা জননী নার্সারিতে ভিড় করছেন। অনেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছেন।
উদ্ভিদবিদদের মতে, ঝুমকো লতা ফুলের প্রধান আকর্ষণ এর মাঝখানের প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার প্রশস্ত পরাগমুকুট। এতে অসংখ্য সরু ডাঁটা থাকে। বাইরের অংশ বেগুনি, মাঝখানে সাদা এবং ডগায় নীল রঙের সমন্বয় ফুলটিকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য।
প্রয়াত উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মা তার বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছেন, ঝুমকো লতা ফুলের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। সেখান থেকে এটি বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, চীন, উত্তর অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এর চাষ ও বিস্তৃতি রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুল হিসেবেও এটি পরিচিত।
এই ফুলকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও লোকজ বিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। ভারতের কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র ও উত্তর প্রদেশের অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী ফুলটির গঠনে শ্রীকৃষ্ণ ও পঞ্চপাণ্ডবের প্রতীক খুঁজে পান। অন্যদিকে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের খ্রিস্টান মিশনারিরা বিশ্বাস করতেন, ফুলটির গঠন ক্রুশবিদ্ধ যিশু খ্রিস্টের স্মারক প্রতীক বহন করে।
এ ছাড়া ঝুমকো লতার বিভিন্ন ভেষজ গুণের কথাও লোকজ চিকিৎসায় প্রচলিত রয়েছে। লতার রস পিঠের ব্যথা উপশমে, পাতার রস মূত্রবর্ধক ও জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়। কাশি, অ্যাজমা, অ্যালার্জি, ডায়রিয়া ও আমাশয়সহ বিভিন্ন সমস্যায় লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার রয়েছে বলে জানা যায়। স্থানীয়ভাবে অনেকে ফুল বেটে মাথার তালুতে ব্যবহার করলে ভালো ঘুম হয় বলেও বিশ্বাস করেন। তবে এসব ভেষজ ব্যবহারের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।





