খুরারোগে ‘খোঁড়াচ্ছেন’ খামারিরা
- জেলায় ১২ গরুর মৃত্যু
- আক্রান্ত প্রায় ৩০০
- ৩ উপজেলায় আক্রান্ত বেশি
- সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা

কুড়িগ্রামে খুরা ও লাম্পি রোগের প্রাদুর্ভাবে বিপাকে প্রান্তিক খামারিরা। জেলায় এরই মধ্যে ১২টি গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ২৫০ থেকে ৩০০ গবাদি পশু। জেলার সদর, রাজারহাট এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় শত শত পশুর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে খামারি, এলাকাবাসী এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ। ঈদের আগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে পুরো জেলায়।
জেলা সদরের কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের জোৎগোবরধন গ্রামের আলতাফ হোসেনের কণ্ঠে হতাশার ছাপ, ‘আমার ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গাভী খুরারোগে আক্রান্ত হয়ে গত সপ্তাহে মারা গেছে। গাভীটি গর্ভবতী ছিল। চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হয়নি। গ্রামে আরও গরু খুরায় আক্রান্ত হয়েছে।’
একই ইউনিয়নের হরিশ্বর গ্রামের কৃষক আবু হোসেনের ভাষ্য, ‘প্রতি বছর ঈদে বিক্রির জন্য দু-একটি গরু পালন করি। যখন গরু বিক্রির সময় হলো, তখনই খুরা রোগে সব শেষ করে দিল। গরুটি খুব অসুস্থ। বিক্রি তো করতে পারব না, বাঁচবে কি না, তাও জানি না।’
ওই গ্রামের আরেক ভুক্তভোগী একরামুল হক। তার খামারে তিনটি গরু খুরারোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে দুগ্ধবতী একটি গাভীর জিহ্বা রোগে খসে গেছে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত একরামুলের কথা, ‘গরুর দুধ বিক্রি করে আমার আয় হয়। এখন সেই আয় বন্ধ। চিকিৎসা করাচ্ছি। কিন্তু গরু-বাছুর বাঁচবে কি না, সেটাই বুঝতে পারছি না।’
কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য তিনটি গরু চার মাস ধরে লালন-পালন করছেন জব্বার মিয়া। বললেন, ‘গরুগুলাক নিয়া টেনশনে আছি। চাইর মাসে খরচ করছি অনেক। এবার হাটত শুনছি দাম নাই। ফির লাম্পি আর খুরারোগ। এগলা নিয়া নানান টেনশনে আছি। আল্লাহ জানে কপালত কী আছে?’ জব্বারের চোখেমুখে শঙ্কা।
সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের পল্লী প্রাণী চিকিৎসক আবুল কালাম আজাদের তথ্য, ‘অনেক গরু খুরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসায় সুস্থও হচ্ছে। তবে ঈদের আগে এ রোগের সংক্রমণ খামারিদের লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
রোগ ছড়ানোর কারণ তুলে ধরেন তিনি, ‘রোগপ্রতিরোধে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনেশন হয়নি। আবার বাজারে ভ্যাকসিনের দাম বেশি হওয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আগে গরুর মালিকরা ভ্যাকসিন কিনতে চান না। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এবার চিকিৎসায় আক্রান্ত গরু সুস্থ হওয়ার হার বেশি।’
উলিপুরের চরাঞ্চলেও গবাদি পশুর মধ্যে ব্যাপক সংক্রমণ দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের পল্লী প্রাণী চিকিৎসক সফিকুল ইসলাম। বললেন, ‘মোল্লারহাট এলাকাসহ ব্রহ্মপুত্র চরাঞ্চলে ব্যাপক খুরারোগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে মোটাতাজা করা গরুগুলো আক্রান্ত হওয়ায় পালনকারীরা অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, খুরারোগ ভাইরাসবাহিত। দ্রুত এক গরু থেকে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক সপ্তাহে জেলায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। কিছু গরু মারা গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় বিপর্যয়ের আশঙ্কা না করলেও চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে হবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমানের তথ্য, ‘তিনটি উপজেলায় সংক্রমণের মাত্রা বেশি হলেও অন্য উপজেলাতেও রোগ দেখা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত শুধু গরুর মধ্যে এ রোগ ছড়িয়েছে। অন্য পশুরাও ঝুঁকিতে আছে। মাঠপর্যায়ে আমরা আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা দিচ্ছি।’




