আয়ের চেয়ে সাড়ে ১২ গুণ ব্যয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বহুল কথিত বাংলা প্রবাদ ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’ হারিয়ে যায়নি আধুনিক শব্দবনে। হারিয়ে যেতে দেয়নি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের উত্তরাঞ্চল সার্কেল! ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি এক টাকা আয়ের বিপরীতে এই দপ্তর খরচ করেছে ১২ টাকা ৬২ পয়সা। ওই সময়ে সার্কেলটির আয় ১৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা, অথচ ব্যয় হয়েছে ১৭৩ কোটি ১ লাখ টাকা, প্রায় সাড়ে ১২ গুণ। ফলে এক বছরেই ঘাটতি ১৫৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের চিত্রও অভিন্ন বলে জানিয়েছে কয়েকটি সূত্র।
ডাক বিভাগের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয় এক বছর পর। সে হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও বছরখানেক। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে চিঠি ও সনাতন ডাকসেবার ব্যবহার দ্রুত কমে গেলেও সেই হারে পরিবর্তন আসেনি ব্যয়ে। বরং খরচের বোঝা বাড়তে বাড়তে এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একসময় মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সরকারি দাপ্তরিক কাজ, আদালতের নথি কিংবা ব্যবসায়িক লেনদেনের অন্যতম ভরসা ছিল ডাক বিভাগ। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা ছিল নতুন খবরের বার্তা। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, ইমেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বেসরকারি কুরিয়ার সেবার বিস্তারে ধারাবাহিকভাবে কমছে ডাকসেবার চাহিদা।
‘গত তিন বছরে নিবন্ধিত ডাকসামগ্রীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে নিবন্ধিত ডাকসামগ্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭১ লাখ ২৮ হাজার, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে আসে ২৪ লাখ ৪৭ হাজারে। সর্বশেষ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার হলেও তিন বছর আগের অবস্থান থেকে তা এখনো অনেক নিচে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরে হারিয়ে গেছে ৪৩ লাখের বেশি নিবন্ধিত ডাকসামগ্রী’— উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
একই চিত্র সাধারণ নিবন্ধিত চিঠির ক্ষেত্রেও। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ ধরনের চিঠির সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ ৬ হাজার। পরের বছর তা কমে হয় ২৪ লাখ ১৬ হাজার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ লাখ ৫৯ হাজারে। তবে এই সামান্য বৃদ্ধি আগের ধস সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
ডাক বিভাগের আয়ও আটকে আছে কয়েকটি খাতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন সংস্থার সেবা ফি ও কমিশন থেকে এসেছে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ডাকটিকিট বিক্রি থেকে আয় ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ডাক মাশুল থেকে আসে আরও ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অন্যান্য সেবা থেকে ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ব্যয়ের বড় অংশ চলে গেছে স্থায়ী খাতে। পেনশন ও অবসর সুবিধা বাবদ ব্যয় ৬৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বেতন-ভাতায় ৩৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অফিস ভাড়ায় ৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। সরবরাহ খাতে খরচ ৩৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা থেকে বেশি। অর্থাৎ কাজের পরিমাণ কমলেও টানা যায়নি ব্যয়ের লাগাম।
সরকারি ডাকসেবা সংস্কারের দাবি জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমদ সফিউদ্দিন বললেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আসেনি ডাক বিভাগের সেবায়। ফলে চিঠিপত্রের ব্যবহার কমার সঙ্গে প্রচলিত ডাকসেবাও স্থবির। তবে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে ই-কমার্স পার্সেল, বিভিন্ন বেসরকারি পার্সেল সেবা ও ডিজিটাল আর্থিক সেবা যুক্ত করলেই বহুগুণে বেড়ে যাবে আয়। সাশ্রয় হবে জনগণের ঘাম ঝরানো করের টাকা।
ডাক বিভাগে এত লোকসানের কারণ জানতে চাইলে সংস্থাটির উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, এটি কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারি সেবা সংস্থা। এখানে আয়ের কোনো বিষয় নেই। তাই ঘাটতি বা লোকসানও বলা যাবে না। আয় বাাড়তে সংস্কারের উদ্যোগ আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার হোসেন বললেন, ‘আধুনিকায়নের চেষ্টা চলছে। নেওয়া হচ্ছে কিছু পদক্ষেপ।’ তবে গত অর্থবছর তথা ২০২৫-২৬ সময়ে আয়-ব্যয়ের অবস্থা জানতে চাইলে এড়িয়ে যান প্রশ্ন।




