পাঁচ বছরে ৩৪% কমেছে এসএসসি পরীক্ষার্থী
- হবিগঞ্জে ঝরে পড়ছে মূলত ছেলেরা
- অল্প বয়সে কাজে ও বিদেশযাত্রায় ঝোঁক

হাওর, পাহাড়, চা বাগান ও সীমান্তবেষ্টিত হবিগঞ্জে পাঁচ বছরে এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে কমেছে পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কমে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশই ছেলে। অল্প বয়সে কাজে যোগ দেওয়া ও বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা এর অন্যতম কারণ।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ হারাবে জেলার তরুণ জনগোষ্ঠী। এতে কাজে লাগানো কঠিন হবে দেশের জনমিতিক সুবিধাও। ঝরে পড়া রোধে বিশেষ নজরদারি ও টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
গত সোমবার প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালে হবিগঞ্জের ৯ উপজেলায় পরীক্ষার্থী ছিল ১৫ হাজার ১২২ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮ হাজার ৭২৮ জন। পাসের হার ৫৭ দশমিক ৭২। জিপিএ ৫ পেয়েছে ৬৭১ জন।
অন্যদিকে ২০২২ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ২২ হাজার ৮৯২ জন। উত্তীর্ণ হয় ১৭ হাজার ৬৯২ জন। পাসের হার ছিল ৭৭ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ হাজার ৪৩৬ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে পরীক্ষার্থী কমেছে ৭ হাজার ৭৭০ জন, যা প্রায় ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৭৬৫ এবং পাসের হার কমেছে প্রায় ১৯।
স্থানীয় শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে জেলায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখনো প্রায় আড়াই লাখ। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে তাদের একটি বড় অংশ। অল্প বয়সে কাজে যোগ দিচ্ছে হাওর, চা বাগান ও সীমান্ত এলাকার ছেলেদের অনেকে। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করছে কেউ কেউ।
এর একটি উদাহরণ বানিয়াচং টেকনিক্যাল স্কুলের শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার। একই প্রতিষ্ঠানে তার সহপাঠী মায়ীশা আক্তার এবার এসএসসিতে জিপিএ ৪.৩৫ পেয়েছে। নিবন্ধন করেও পরীক্ষায় অংশ নেয়নি হাবিবা। পরিবারের ভাষ্য, প্রবাসী এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ের আলোচনা চলছে তার।
আবার আজমিরীগঞ্জের জুবায়ের আহমেদ এসএসসির নিবন্ধনের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে চলে গেছে বিদেশে। তার বাবা ওয়ারিশ মিয়া বলেছেন, ‘পড়ালেখায় মন বসত না। তাই আর চেষ্টা না করে আগেই বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
হবিগঞ্জ জহুর চান বিবি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, ‘চা বাগান ও হাওরাঞ্চলে অল্প বয়সে কাজে যোগ দেওয়া, বিদেশমুখিতা, শিক্ষকদের অবহেলা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। দুর্গম এলাকার অনেক শিক্ষক দূর থেকে যাতায়াত করায় পাঠদানে আন্তরিকতার ঘাটতিও দেখা যায়।’
সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জহিরুল হক শাকিল বলেছেন, ‘কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় শক্তি। কিন্তু তরুণরা যদি অল্প বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে কম দক্ষতার কাজে যুক্ত হয়, তাহলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হবে। ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মশক্তির ঘাটতি সৃষ্টি হতে পারে।’
ড. জহিরুল হক শাকিলের মতে, ‘দুর্গম ও পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোয় শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ঠেকাতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের আবাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।’




