চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা
‘আল্লাহ পূরণ করেছেন আমার ইচ্ছাটা’

নুরে আলম ইসলাম সবুজ
নুরে আলম ইসলাম সবুজ। মাদারীপুরের তরুণ খামারি। স্বপ্ন ছিল সফল উদ্যোক্তা হওয়ার। চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করলেন গবাদিপশুর খামার। মাত্র ২৪টি গরু দিয়ে শুরু। দুই বছরের ব্যবধানে দাঁড়াল প্রায় ৪০টি ষাঁড়। তালুকদার অ্যাগ্রো পার্ক এখন স্বপ্নের ঠিকানা সবুজের।
২০১৭ সালে এমবিএ সম্পন্ন করেন সবুজ। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে চাকরিও পেয়েছিলেন। পরে চাকরির সুযোগ হয় গ্রামীণ ব্যাংকেও। তবে শুরু থেকেই তার ইচ্ছা ছিল একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার। বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিও দেখে ও প্রশিক্ষণ নিয়ে গবাদিপশু পালন সম্পর্কে নেন ধারণা।
সেই ধারণা কাজে লাগিয়ে সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের রাজারচর এলাকায় গড়ে তোলেন ‘তালুকদার এগ্রো পার্ক’। ২০২৪ সালে মাত্র ২৪টি গরু দিয়ে শুরু। বর্তমানে তার খামারে প্রায় রয়েছে ৪০টি ষাঁড়।
বর্তমানে খামারে প্রায় এক কোটি টাকার গরু রয়েছে। খামারে সার্বক্ষণিক পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। ছোটবেলা থেকেই বড় কিছু করার স্বপ্ন ছিল। এই থেকেই গরুর খামার তৈরি
সবুজের ভাষ্য, খামারের প্রতিটি গরুকে প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা হচ্ছে। কোনো ধরনের ক্ষতিকর ইনজেকশন বা স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয় না। খড়, খৈল, ভুসি, গুড়ের চিটা, চাল-ডালের গুঁড়া এবং নিজেদের জমিতে উৎপাদিত নেপিয়ার ঘাসই গরুর প্রধান খাদ্য।
এদিকে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মাদারীপুরের খামারগুলোতে বেড়েছে ব্যস্ততা। দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন খামারিরা। তবে গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও চাকরি ছেড়ে গড়ে তোলা নিজের খামার নিয়ে আশাবাদী তরুণ উদ্যোক্তা সবুজ।
বুধবার সবুজের খামার ঘুরে দেখা যায়, গরুর পরিচর্যা, গোসল করানো, খাবার সরবরাহ, খামার পরিষ্কার ও স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা।
‘বর্তমানে খামারে প্রায় এক কোটি টাকার গরু রয়েছে। খামারে সার্বক্ষণিক পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। ছোটবেলা থেকেই বড় কিছু করার স্বপ্ন ছিল। এই থেকেই গরুর খামার তৈরি’— বলছিলেন উদ্যোক্তা সবুজ।
ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় স্রষ্ঠাকে দিলেন ধন্যবাদ। বললেন—‘এটা আমার নেশায় ছিল, যে আমি একটি বড় ধরনের কিছু করব। আমার সেই নেশাটাই পূরণ করেছেন আল্লাহ।’
তবে খামার পরিচালনায় বাড়তি খরচ নিয়ে উদ্বেগও জানালেন সবুজ। তার ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে খৈল ও ভুসির দাম। একটি গরু ছয় থেকে সাত মাস লালন-পালনে ব্যয় হচ্ছে লক্ষাধিক টাকা।
‘কোরবানির হাটে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে স্থানীয় খামারিরা আরও সংকটে পড়তে পারে’— শঙ্কা তরুণ এই উদ্যোক্তার।
সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়ে উদ্যোক্তা সবুজ বললেন, ‘দেশীয় খামারিরা অনেক কষ্ট করে গরু পালন করছেন। সরকার যদি খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে উপকৃত হবেন খামারিরা।’
কথা হলো খামারের শ্রমিক ইসমাইল মোড়লের সঙ্গে। দুই বছর ধরে এই খামারে কাজ করছেন তিনি। প্রতিদিন প্রায় ৪০টি গরুর খাবার সংগ্রহ ও পরিচর্যার কাজ করেন ইসমাইল।
তার মতে, অনেক কষ্ট করে খামারটি গড়ে তুলেছেন মালিক। চাকরি ছেড়ে খামার করলেও এখন অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে।
আরেক শ্রমিক রাকিব সরদার জানালেন, প্রতিদিন মাদারীপুর শহর থেকে ভ্যানে করে খৈল, ভুসি ও কুড়া এনে গরুর খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। তার আশঙ্কা, ভারতীয় গরু বাজারে এলে স্থানীয় খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।
স্থানীয়দের মতে, নিরাপদ ও দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করছেন খামারিরা। তবে গো-খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে খামার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার প্রণোদনা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে আরও উৎসাহিত হবেন খামারিরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মাদারীপুরের পাঁচটি উপজেলায় গরু মোটাতাজাকরণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ বছর জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার গরু, ১৬৫টি মহিষ, ২৪৬টি ভেড়া এবং প্রায় ৩৮ লাখ ছাগল। জেলার চাহিদার তুলনায় পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক খামারি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গরু পাঠাচ্ছেন।
‘ঈদকে সামনে রেখে জেলার খামারগুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। খামারিদের নিরাপদ উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে দেওয়া হচ্ছে পরামর্শ। ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার না করতে সচেতন করা হচ্ছে’—জানালেন মাদারীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আছির উদ্দিন।
‘তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি খামারিদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও পাঠানো হচ্ছে’—উল্লেখ করেন এই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।





