কুমারখালীতে হয়নি বীরনিবাস, মুক্তিযোদ্ধার আশ্রয় প্রতিবেশীর বারান্দায়
- ২ মাসের কাজ আড়াই বছরেও ঘর পাননি মুক্তিযোদ্ধারা
- কেউ ধারদেনা করে ঘর তুলে কাটাচ্ছেন দিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন করার পর জীবনের শেষ সময়ে একটি পাকা ঘরে নিশ্চিন্তে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কিয়ামউদ্দিন সরদার। সরকারি বরাদ্দে সেই ঘর নির্মাণের জন্য ভেঙে দিয়েছিলেন নিজের জরাজীর্ণ টিনের ঘরটিও। কথা ছিল, দুই মাসের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে নতুন ঘর। কিন্তু কাজ শুরুর আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও বসবাসের উপযোগী হয়নি ঘরটি। এখন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্ত্রীর সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে।
একই দুর্ভোগে পড়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আরও পাঁচ বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাদের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া ছয়টি বীরনিবাসের একটির কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫, আরেকটির ১০ শতাংশ। ছাদ ঢালাইয়ের পর থেমে রয়েছে বাকি চারটির কাজও। নির্মাণকাজের জন্য পুরনো ঘর ভেঙে জায়গা ছেড়ে দেওয়ায় কেউ থাকছেন প্রতিবেশীর বারান্দায়, কেউ নিজের থাকার ব্যবস্থা করেছেন ধারদেনা করে।
কুমারখালী পৌরসভার খয়েরচারা এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মকবুল হোসেনের জন্য বরাদ্দ করা বীরনিবাসটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল। প্রায় ১৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই বছরের ১৯ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। তৈরি হয়েছে ঘরের মেঝে পর্যন্ত। সেখানে জমেছে শ্যাওলা, চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিজের তৈরি টিনশেড ঘরের বারান্দায় বসে আছেন মকবুল হোসেন। সরকারি ঘর না পাওয়ার আক্ষেপ জানিয়ে তিনি বললেন, ‘সরকার একটা ঘর দিছিল। কিন্তু ঠিকাদার করে দেয়নি। ইউএনওর কাছে বহুবার গেছি, তাতেও কাজ হয়নি। পরে ছোট ছেলের সঙ্গে মিলে একটা ঘর করে নিয়েছি।’
সময়মতো সরকারি ঘর পেলে ধারদেনা করে এত টাকা খরচ করতে হতো না বলে আক্ষেপ করলেন তিনি। জানালেন, ঠিকাদার কয়েক দিন কাজ করে চলে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। বাধ্য হয়ে ধারদেনা ও ব্যাংকঋণ নিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজেদের থাকার ঘর তৈরি করেছেন তারা। মকবুল হোসেনের ছোট ছেলে মুদিদোকানি জাকিদুল হোসেন বললেন, ‘যেটুকু কাজ হয়েছে তাতেও নানা অনিয়ম। কবে ভাঙে পড়বিনি। আমরা আর ঘর চাই না। সরকার যদি মালামাল ফেরত নিত, সবচেয়ে ভালো হতো।’
অন্যের বাড়িতে শেষ বয়স
যদুবয়রা ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা কিয়ামউদ্দিন সরদারের অবস্থা আরও করুণ। পাকা ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর আশায় ভেঙে দিয়েছিলেন নিজের পুরনো ঘর। কিন্তু কাজ শুরুর আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন ঘরের কাজ মেঝের ভিত্তি পর্যন্ত গড়িয়েছে। সেখানে আগাছা জন্মেছে, জমেছে শ্যাওলা। এখন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত কিয়ামউদ্দিন স্ত্রী আছিয়া খাতুনকে নিয়ে থাকছেন পাশের বাড়িতে।
আছিয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘একটা ভাঙা টিনের ঘর ছিল। এই ঘর পাকা হবিনি বলে সেই ঘর ভাঙে ফেলা দিচ্ছি। কিন্তু কনটেক্টার কবে চলে গেছে, আর আসেনি। এখন কষ্ট করে পরের বাড়ি আছি। জলদি ঘরডা করে দিলি এটু বাঁচতানে।’
একই অর্থবছরে বীরনিবাসের জন্য নিজের জরাজীর্ণ ঘর ভেঙে জায়গা ছেড়ে দেন চাপড়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সামসুদ্দিন শেখও। নির্মাণকাজ শুরু করে ছাদ ঢালাইয়ের পর ঠিকাদার চলে যাওয়ায় স্ত্রীকে নিয়ে এখন প্রতিবেশীর ঘরের বারান্দায় থাকছেন তিনি।
সামসুদ্দিন শেখ বললেন, ‘বছরদেড়েক আগে ছাদ ঢালায় দিয়ে কনটেক্টার চলে গেছে। বাঁশ-খুঁটি ওম্বায় রয়ছে। আর কাজ করতেছে না। ঘরের অভাবে পরের বারান্দায় থাকি। এত কষ্ট করা যায়?’ প্রতিবেদককে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, ‘দেখতেছেন তো ঘরের অবস্থা। ভাঙা বেড়ার ভিতর শুয়ে থাকি। কী করব?’
চোখের পানি মুছতে মুছতে সামসুদ্দিন শেখের বৃদ্ধ স্ত্রী আলেয়া খাতুন বললেন, ‘ঘর নি বলেই তো এত কষ্ট। না থাকলে কোন থাহা যায়। সরকার করে দিচ্ছে না, তাই হচ্ছে না। স্বামী অসুস্থ মানুষ। বাইরে যাতি গেলে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি যিনি হয়।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুদ্দিন শেখের বয়স ৮৪ বছর। নিজের ঘর ভেঙে বীরনিবাসের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন কুমারখালী পৌরসভার সাঁওতা গ্রামের এই মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সম্পূর্ণ হয়নি ঘরটি। এখন তার একটাই চাওয়া, মৃত্যুর আগে নিজের ঘরে যেন অন্তত কিছুদিন থাকতে পারেন।
নুরুদ্দিন শেখ বললেন, ‘আমার ভাঙা ঘর ছিল। সরকার বলল ঘর দিব, তাই ভেঙিছি। কিন্তু দুই বছরের বেশি হয়ে গেল, এখনো সেই ঘর কমপ্লিট হয়নি। আমার বয়স ৮৪ বছর। আর বাঁচব কয়দিন? মরার আগে এই ঘরে একটু শুয়ে যেতে চাই।’ নুরুদ্দিনের স্ত্রী আতরী খাতুন জানালেন, ঠিকাদারের কথায় পুরনো টিনের ঘর ভেঙে দিয়েছিলেন তারা। এখন অন্যের জায়গায় আর কতদিন থাকা যায়, সে চিন্তায় দিন কাটছে।
ছয় ঘরের কাজই অসম্পূর্ণ
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ প্রকল্প-৩-এর আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কুমারখালীতে ছয়টি বীরনিবাস নির্মাণের বরাদ্দ দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মোট বরাদ্দ প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। কাজ পায় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মেসার্স অনু ট্রেডার্স। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল কাজ শুরু করে ১৯ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল।
মকবুল হোসেন ও কিয়ামউদ্দিন সরদারের ঘরের অগ্রগতি যথাক্রমে ৫ ও ১০ শতাংশ। অন্য চারটি ঘর বাটিকামারা এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুর রহমান, দুর্গাপুরের সামসুদ্দিন শেখ, সাঁওতার নুরুদ্দিন শেখ এবং বাগুলাট ইউনিয়নের মো. সাদ আলীর। এসব ঘরের ছাদ ঢালাই পর্যন্ত কাজ হয়েছে। তবে সরানো হয়নি নির্মাণকাজের বাঁশ-খুঁটি। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় ঘরের দেয়াল ও ছাদে শ্যাওলা জমেছে, ভেতরে জন্মেছে আগাছা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, প্রশাসনের যথাযথ তদারকি না থাকায় কাজ শেষ হয়নি। ফজলুর রহমানের জামাতা মো. মনিরুল ইসলামের ভাষ্য, নির্মাণকাজের মান নিয়ে তাদের অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদার ও প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও সমাধান পাননি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
দায় এড়াচ্ছেন না ঠিকাদার, তবু শেষ হয়নি কাজ
নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করলেন মেসার্স অনু ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম। তার দাবি, অন্য এক ঠিকাদারকে কাজের দায়িত্ব দেওয়ায় বিলম্ব হয়েছে। এখন নিজেই কাজ করছেন। দুই-এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বিপ্লব হোসেনের তথ্য, ঠিকাদারের অবহেলায় একটি ঘরের কাজ ৫, আরেকটির ১০ এবং বাকি চারটির কাজ প্রায় ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. দোস্তদার হোসেন জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ঠিকাদারের অবহেলায় কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারকে কয়েকবার চিঠি দিয়েও কাজ শেষ করানো যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তার দাবি, নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম হয়নি।
কুমারখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাভিদ সারওয়ার এবং সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান রিফাত বললেন, ‘ঠিকাদারকে তিনটি তাগিদপত্র দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’



