নীলকণ্ঠের নীল মায়া

সবুজ পাহাড়ের বুক। চারদিকে চিরসবুজের নীরবতা। হঠাৎ কোনো এক পাতাহীন মগডালে এসে বসে রঙিন একটি পাখি। শরীর জুড়ে নীলের আভা, ডানায় সবুজের ছোঁয়া। কিছুক্ষণ স্থির থেকে আচমকাই উড়ে যায়— আবার ফিরে আসে সেই ডালে। যেন পাহাড়ি বনের নীল আকাশ ডানা মেলে নেমে এসেছে গাছের ডালে।
এই অপূর্ব পাখিটির নাম পাহাড়ি নীলকণ্ঠ। বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখিদের মধ্যে এটি অন্যতম। ইংরেজি নাম ওরিয়েন্টাল ডলারবার্ড। উড়লে ডানার নিচে দেখা যায় গোলাকার রুপালি ছোপ। দেখতে অনেকটা আমেরিকান সিলভার ডলার মুদ্রার মতো বলেই এমন নামকরণ। বৈজ্ঞানিক নাম Eurystomus orientalis। করাসিডি বা নীলকণ্ঠ গোত্রের এ পাখি মূলত এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়ার কিছু দ্বীপপুঞ্জে বিস্তৃত।
বাংলাদেশের প্রকৃতিতেও এর দেখা মেলে, তবে খুব সহজে নয়। মূলত সিলেট বিভাগের পাহাড়ি চিরসবুজ বনেই এদের বিচরণ। চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ বনেও মাঝেমধ্যে দেখা যায়। সম্প্রতি হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে একদল পাহাড়ি নীলকণ্ঠের ছবি তুলেছেন প্রকৃতিপ্রেমী শৌখিন ফটোগ্রাফার সাহেদ আহমেদ। তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে পাহাড়ি বনের এই দুর্লভ নীল সৌন্দর্যের নানা মুহূর্ত।
প্রকৃতির এই পাখির সৌন্দর্য শুধু রঙে নয়, তার চলনেও। সাধারণত একা কিংবা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। গাছের পাতাহীন উঁচু ডাল অথবা বৈদ্যুতিক তারে বসে চারপাশে নজর রাখে। হঠাৎ ঝাঁপিয়ে উড়ে গিয়ে শিকার করে কোনো পোকামাকড়।
বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. সুভাষ চন্দ্র দেব বললেন, পাহাড়ি নীলকণ্ঠ চিরসবুজ বন ও বনের প্রান্তে বসবাস করে। সাধারণত একাকী বা জোড়ায় দেখা যায় এদের। পাখিটি মূলত কীটপতঙ্গভুক। এর ডাক অনেকটা ‘ক্যাঁক-ক্যাঁক-ক্যাঁক’ ধরনের।
মাঝারি আকারের এ পাখিটির গলায় নীলচে আভা রয়েছে। বুক, পেট ও ডানায় ছড়িয়ে থাকে সবুজাভ নীল রঙ। শরীরের ওপরের অংশ কালচে নীল। দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬ থেকে ৩১ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১২৩ থেকে ১৫০ গ্রাম। উড়ন্ত অবস্থায় ডানার নিচের রুপালি ডিম্বাকৃতির ছোপই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। ঠোঁট ও পা গোলাপি-লাল। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে প্রায় একই রকম। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঠোঁটের রঙ তুলনামূলক অনুজ্জ্বল।
পাহাড়ি নীলকণ্ঠের জীবনযাপনও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে রয়েছে। মার্চ থেকে জুন— এ সময়টিই তাদের প্রজননকাল। গাছের প্রাকৃতিক কোটরকে তারা বেছে নেয় বাসা হিসেবে। সেখানে পাড়ে তিন থেকে চারটি সাদা ডিম। ১৭ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বের হয় ছানা। প্রায় এক মাস বয়সে ছোট্ট পাখিগুলো ডানা মেলে উড়তে শেখে। তাদের আয়ুষ্কাল সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় বছর।
বাংলাদেশে নীলকণ্ঠ গোত্রের তিন প্রজাতির দেখা মেলে। তবে পাহাড়ি নীলকণ্ঠ যেন একটু আলাদা। তার সৌন্দর্যে আছে পাহাড়ি বনের নিজস্ব রহস্য। সবুজের গভীরে নীলের এমন মায়াবী উপস্থিতি খুব বেশি দেখা যায় না। তাই সাতছড়ির বনে যখন কোনো পাতাহীন ডালে এসে বসে পাহাড়ি নীলকণ্ঠ, তখন মুহূর্তটিকে মনে হয় প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা কোনো ছবি।
বনের নীরবতা ভেঙে
তার ‘ক্যাঁক-ক্যাঁক-ক্যাঁক’ ডাক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তারপর হঠাৎ ডানা মেলে আকাশে মিলিয়ে
যায় রুপালি ছোপের ঝিলিক। পাহাড়ের সবুজের ভেতর আবার ফিরে আসে নীরবতা। আর সেই নীরবতার
বুকেই থেকে যায় পাহাড়ি নীলকণ্ঠের নীল মায়া।



