বৈষম্যের জংশনে ‘রংপুর এক্সপ্রেস’
- ৮৪০ আসনের মধ্যে রংপুরের জন্য বরাদ্দ ১৮৩ টিকিট
- টিকিট না পেয়ে ঝুঁকি নিয়ে অনেকে বাসে যাতায়াত করেন
- বেশি টাকা দিয়ে কালোবাজারে কিনতে হয় টিকিট
- ১৪ বছর ধরে চলছে এই অবস্থা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রংপুর-ঢাকা পথের একমাত্র আন্তঃনগর ট্রেন ‘রংপুর এক্সপ্রেস’। বৈষম্যের কারণে ট্রেনটির আসন সংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ যাত্রীও রংপুর রেলস্টেশন থেকে যাতায়াত করতে পারছে না। এই ট্রেনের টিকিট যেন সোনার হরিণ, অনলাইনের টিকিটও বিক্রি হয় কালোবাজারে।
ট্রেনটির ৮৪০ আসনের বিপরীতে রংপুরের জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৮৩টি টিকিট। চালুর ১৪ বছরেও ট্রেনটি বৈষম্যের গ্যাঁড়াকল থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। কর্তৃপক্ষও বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রংপুর এক্সপ্রেসের ১৪টি বগিতে মোট আসন সংখ্যা ৮৪০। এর মধ্যে রংপুরের জন্য বরাদ্দ শোভন চেয়ার ১৫০টি, এসি ২৫টি এবং এসি বার্থ ৮টি। বিভাগীয় নগরী রংপুরের জন্য মাত্র ১৮৩টি আসন বরাদ্দ থাকায় প্রতিনিয়ত স্টেশনে ঢাকার টিকিটের জন্য অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে।
২০১১ সালের ২১ আগস্ট ঢাকা ও রংপুরের মধ্যে চালু হওয়া এই ট্রেনটি রবিবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন চলাচল করে। প্রতিদিন ঢাকা থেকে একটি এবং রংপুর থেকে একটি ট্রেন ছেড়ে যায়।
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী ডিভিশন অনেক সমৃদ্ধ হলেও লালমনিরহাট ডিভিশনের অবস্থা তিমিরেই রয়ে গেছে। ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে লালমনিরহাট ডিভিশনে নতুন বগি যুক্ত হয়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাসে এই দীর্ঘসময় লালমনিরহাট ডিভিশন চলছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় মেরামত করা বগি দিয়ে। তাদের মতে, রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটিতে আরও দুটি শোভন ও দুটি এসি চেয়ার কোচের বগি বাড়ানো হলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে।
ট্রেনে রংপুর থেকে ঢাকায় প্রায়ই যাতায়াতকারী এসএম খলিল বাবু ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘প্রতিবার ঢাকায় যেতে টিকিট না পাওয়ার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। বেশিরভাগ সময় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে কালোবাজারে টিকিট কিনতে হয়। রংপুরের মানুষের সুবিধার জন্য এ ট্রেন চালু করা হলেও আসন বরাদ্দে বৈষম্য রয়েই গেছে।’ তিনি জানালেন, রংপুর থেকে ঢাকায় যেতে সীমিত আসনের কারণে এই ট্রেনের টিকিট সহসা মেলে না। ফলে বঞ্চিত হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসে যেতে বাধ্য হন অনেকেই। রেজাউল করিম জীবনসহ বেশ কয়েকজন ট্রেনযাত্রী বলেছেন, অতীতে এমন বিষয় নীরবে সহ্য করলেও আশা ছিল চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এই ট্রেনের বৈষম্য দূর হবে। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি। তারা এই বৈষম্য অবসানের দাবি জানিয়েছেন। রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেছেন, ‘বিভাগীয় নগরী রংপুর থেকে ঢাকায় যেতে শুধু রংপুর এক্সপ্রেস নয়, একাধিক ট্রেন প্রয়োজন। এজন্য অনেক আন্দোলনও হয়েছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই ট্রেনের ক্ষেত্রেও গত ১৪ বছরে বৈষম্যের গ্যাঁড়াকল থেকে বের হতে পারেনি রংপুরবাসী। যাত্রীদের সুবিধার্থে ‘রংপুর এক্সপ্রেস’ ট্রেনে অন্তত বগি বাড়িয়ে আসন বৃদ্ধির দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে রংপুর রেলস্টেশনে দেখা যায়, আন্তঃনগর রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটির টিকিট কাউন্টার বন্ধ। টিকিট নিতে আসা নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার রহমত আলী ও ধাপ এলাকার শহিদুল ইসলাম নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, ‘কখনোই রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কাউন্টারে পাওয়া যায়নি। আগে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই বেশি টাকা দিলে কালোবাজারে টিকিট মিলত। এখন অনলাইনে টিকিট বিক্রি হলেও সীমিত আসনের কারণে তাও সবার ভাগ্যে জোটে না।’
অনলাইনের টিকিটও কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ তুলে তারা জানালেন, সুযোগসন্ধানীরা অনলাইনে আগেই সব টিকিট কেটে ফেলেন। পরে ফেসবুকে ‘টিকিট আছে’ বলে প্রচার করে বেশি দামে তা বিক্রি করেন। অবশ্য বিষয়টি নাকচ করে স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট শংকর গাঙ্গুলী বললেন, ‘এখন শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রি হয়। আগে সুযোগসন্ধানীরা সুযোগ নিলেও বর্তমানে কালোবাজারে টিকিট বিক্রির সুযোগ নেই।’ তিনি স্বীকার করেন, বিভাগীয় নগরী রংপুরে ওই ট্রেনের ১৮৩টি আসন একেবারেই কম, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে আসন সংকটের বিষয়টি দেখছেন বলেও জানালেন তিনি।






