বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এলজিইডির প্রকল্প, পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

ছবিঃ আগামীর সময়
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার আজিজনগর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বুক চিরে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। উন্নয়নের নামে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পুরো বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদ ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের আজিজনগর স্টেশন এলাকার পশ্চিম দিক থেকে নুর-আয়েশার টেক পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম এস আমিন এন্টারপ্রাইজ।
তবে স্থানীয় পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, এলাকাটিতে ইতোমধ্যে চলাচলের জন্য একাধিক বিকল্প সড়ক থাকার পরও সংরক্ষিত বনের মাঝ দিয়ে নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, কিছু প্রভাবশালী মহলের সুবিধা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত সড়কের আশপাশে আগে থেকেই কয়েকটি চলাচলযোগ্য রাস্তা রয়েছে। পাশাপাশি বন বিভাগের জবরদখলকৃত কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি বসতি গড়ে উঠেছে। পরিবেশবিদদের মতে, নতুন সড়ক নির্মাণ হলে এসব দখলদার আরও উৎসাহিত হবে এবং ধীরে ধীরে বনভূমি দখলের প্রবণতা বাড়বে।
আজিজনগর বনবিটের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়, এটি অসংখ্য প্রাণের আবাসস্থল, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ভিত্তি এবং জলবায়ু সুরক্ষার অন্যতম প্রধান অবলম্বন, বলছিলেন পরিবেশবাদী সংগঠন 'ধরা'-এর সমন্বয়ক সানজিদা রহমান।
তার মতে, বনের মাঝখান দিয়ে রাস্তা তৈরি হলে বনভাগ খণ্ডিত হয়ে যায়। এতে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং তাদের আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে মানুষের অনুপ্রবেশ বাড়ে, ফলে অবৈধ গাছকাটা, বন্যপ্রাণী শিকার ও ভূমি দখলের মতো অপরাধ বেড়ে যায়। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি প্রকৃতির ধ্বংস ডেকে আনে, তবে তা কখনোই টেকসই হতে পারে না।
আজিজনগর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিট কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসিফ মিয়ার দাবি, বন বিভাগের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় বা অনুমতি ছাড়াই এলজিইডি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।
‘রাস্তা নির্মাণের জন্য যখন মাটি কাটার কাজ শুরু হয়, তখন আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাঁধা দিই। কিন্তু আমাদের আপত্তি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে এভাবে রাস্তা নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। এটি পরিবেশ ও আইন, দুই দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য।’
এ বিষয়টি জানা মাত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকল্পটি বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন চুনতী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখ।
‘বন ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। আমরা চাই উন্নয়ন হোক, কিন্তু তা যেন প্রকৃতি ধ্বংসের বিনিময়ে না হয়। বনভূমি একবার ধ্বংস হয়ে গেলে তা আর সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না।’
বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না এলজিইডির চকরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সৌরভ দাশ। ‘আমি সম্প্রতি চকরিয়ায় যোগদান করেছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। খোঁজ নিয়ে পরে সঠিক তথ্য জানাতে পারব।’
এ ধরনের তথ্য পাওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন ইউএনও শাহীন দেলোয়ার। তবে এটি তার এখানে যোগদানের আগের প্রকল্প বলে নিশ্চিত করেছেন।
‘যতটুকু জেনেছি সেখানে আগে থেকে একটি ইটের সড়ক ছিল। তারপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ যোগ করেন ইউএনও।
নতুন রাস্তা নির্মাণ হলে পরিবেশের বিপর্যয়ের আশঙ্কা বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুর জাহানের। ‘ওই এলাকায় নতুন রাস্তা নির্মাণ হলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যে ভূমিদস্যুদের দখলে শত শত একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। এর ওপর সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হলে নির্বিচারে বন উজাড়, বনভূমি দখল এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকি আরও বাড়বে।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বন একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র। এখানে প্রতিটি গাছ, পাখি, প্রাণী, মাটি ও জল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যখন একটি রাস্তা বনের মাঝ দিয়ে কেটে দেওয়া হয়, তখন সেই বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে যায়। এর ফলে শুধু বন্যপ্রাণী নয়, পুরো এলাকার জলবায়ু ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
সচেতন মহলের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) করা জরুরি। পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। বরং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পিত উন্নয়নই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পথ।
স্থানীয়দের মতে, আজিজনগর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কেবল একটি বনভূমি নয়, এটি প্রকৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার, যেখানে অসংখ্য প্রাণের বসতি। এই বন রক্ষা করা মানে শুধু গাছ বাঁচানো নয়, বরং মানুষের ভবিষ্যৎ ও পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করা।




