এক শূন্যে অনন্তপুরে অন্তহীন সমস্যা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাত্র একটি অতিরিক্ত শূন্য। যার খেসারত দিচ্ছেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর মৌজার জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা। সরকারি মূল্যতালিকায় ‘বাড়ি’ শ্রেণির জমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬২ টাকা। তবে দলিল লেখকদের ভাষ্য, প্রায় এক যুগ আগে প্রতি শতাংশ জমির দাম ছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬২ টাকা। কিন্তু একটি অতিরিক্ত শূন্য যুক্ত হয়ে সেটি বর্তমানে ১০ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬২ টাকা হিসেবে বহাল রয়েছে।
সে হিসাবে এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমির বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৩ কোটি ৪২ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে মোট দামের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থাৎ ২৫ লাখ ৭০ হাজার ১৯৩ টাকা রাজস্ব দিতে হয় সরকারকে। সব মিলিয়ে দাম দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকায়। অথচ বর্তমানে ওই এলাকায় প্রতি শতাংশ জমি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকায়। ভূমি অফিসের এমন ভুলের কারণে অনেকে জমি কিনেও পারছেন না দলিল নিবন্ধন করতে। ফলে একদিকে ক্রেতা-বিক্রেতারা হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত, অন্যদিকে নিবন্ধন না হওয়ায় সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব।
আশপাশের মৌজায় জমির মূল্য অনেক কম হলেও এই ভোগান্তির চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অনন্তপুর গ্রামে। ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের গ্রামটি একেবারেই প্রত্যন্ত এলাকায়। যোগাযোগ ব্যবস্থাও দুর্বল, অধিকাংশ সড়কই কাঁচা। এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। রাঙ্গামাটিয়া, আনুহাদি, অনন্তপুর, হরিপুর, আকতা ও বিষ্ণরামপুর— এই ছয়টি মৌজাতেই নিয়মিত কেনাবেচা হয় জমি। কিন্তু শুধু অনন্তপুর মৌজার বাড়ি শ্রেণির জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক জটিলতা।
২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের মৌজাভিত্তিক মূল্যতালিকা অনুমোদন করে বাজারমূল্য নির্ধারণ কমিটি। যার সভাপতি ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা রেজিস্ট্রার পথিক কুমার সাহা। সদস্য সচিব ছিলেন ফুলবাড়িয়া সাব-রেজিস্ট্রার মো. ওমর ফারুক এবং সদস্য ছিলেন ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসান। ওই তালিকায় অনন্তপুর মৌজার বাড়ি শ্রেণির জমির প্রতি শতাংশের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬২ টাকা। তালিকায় এই মূল্যের পাশে সাংকেতিকভাবে ইংরেজি ‘পি’ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে, যা দিয়ে বোঝানো হয়েছে আগে বাড়ির জমির মূল্য একই নির্ধারণ ছিল।
পাশের মৌজাগুলোর মূল্যতালিকা তুলনা করলে বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি তালিকা অনুযায়ী, রাঙ্গামাটিয়া মৌজায় বাড়ি শ্রেণির জমির দাম প্রতি শতাংশ ২০ হাজার ৯৯৭ টাকা, আনুহাদি মৌজায় ৮ হাজার, আকতায় ১২ হাজার ৬৯০, হরিপুরে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৬ এবং বিষ্ণরামপুরে ৯ হাজার ৭৯১ টাকা। একই ইউনিয়নের পাশাপাশি মৌজাগুলোর তুলনায় অনন্তপুরের মূল্য কয়েক গুণ বেশি। যার প্রভাব পড়ছে জমি বেচাকেনায়।
প্রায় ছয় মাস আগে অনন্তপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান একই গ্রামের শহিদুল্লার কাছ থেকে ৫ কাঠা জমি কেনেন ১০ লাখ টাকায়। স্থানীয়ভাবে অর্থ পরিশোধের পর দলিল নিবন্ধন করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সরকারি মূল্য অনুযায়ী ওই জমির দাম ধরা হচ্ছে প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। সেই হিসাবে শুধু সরকারি রাজস্ব বাবদই পরিশোধ করতে হবে প্রায় ২৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত তিনি দলিল নিবন্ধন না করেই ফিরে যান।
ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফুলবাড়িয়া উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার রাফায়েল ফাতেমীর ভাষ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নজরে এসেছে তারও। তবে স্থানীয়ভাবে সুযোগ নেই এটি সংশোধনের। নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হলে থাকতে পারে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, এ ব্যাপারে আবেদন পেলে তারা উদ্যোগ নেবে। ‘ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আবেদন করলে বাজারমূল্য সংশোধনের সুপারিশসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে— জানালেন ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম সোহাগ।





