নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার তীরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণে আপত্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে খানপুরের বরফকল এলাকায় অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ও বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৬১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে বলে আশা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। তবে প্রকল্পটিকে অপরিকল্পিত ও জনস্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক অধিকার ফোরাম। সংগঠনটির আশঙ্কা, টার্মিনাল চালু হলে শহরে যানজট, পরিবেশদূষণ ও জনদুর্ভোগ বাড়বে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ নৌপথে কনটেইনার পরিবহন এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়াতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। এতে ভূমি উন্নয়ন, জেটি ও কার্গো টার্মিনাল নির্মাণ, কনটেইনার, কার্গো ওঠানামার যন্ত্রপাতি কেনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প বাতিল দাবিতে গত ২৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয় নাগরিক অধিকার ফোরাম। পরে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছেও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় করছেন ফোরামের নেতারা।
ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেছেন, শীতলক্ষ্যা নদী নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ, জনজীবন, নৌ-যোগাযোগ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নদীর নাব্য, পানিপ্রবাহ, নৌ-চলাচল ও পরিবেশের ওপর প্রভাব যথাযথভাবে যাচাই না করে টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংকট তৈরি হতে পারে।
মাহবুবুর রহমান মাসুমের দাবি, প্রস্তাবিত টার্মিনাল এলাকায় ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী প্রশস্ত সড়ক বা বাইপাস নেই। ফলে কনটেইনারবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান শহরের সরু সড়ক ব্যবহার করলে যানজট বাড়বে খানপুরসহ আশপাশের এলাকায়। ওই এলাকায় রয়েছে হাসপাতাল, কলেজ, বিপণিবিতান ও সরকারি কার্যালয়। এতে পুরো শহরের চলাচল ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়তে পারে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, খানপুরের কাছাকাছি পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার পোর্ট এবং মুক্তারপুরে বেসরকারি টার্মিনাল রয়েছে। পানগাঁও পোর্ট ২০১৩ সালে চালু হলেও ব্যবসায়ীদের আগ্রহের অভাবে এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার হচ্ছে না বলে তাদের দাবি। এমন পরিস্থিতিতে কাছাকাছি এলাকায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীর নাব্য ও নৌ-চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। ভারী যানবাহনের চাপ বাড়লে সড়ক দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগের আশঙ্কাও রয়েছে। তার মতে, বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা ও সম্প্রসারণের সুযোগ যাচাই না করে নতুন প্রকল্প নেওয়া হলে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, অনুমোদিত ব্যয় ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন মাহবুবুর রহমান ইসমাইল।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের ভাষ্য, বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। স্থানীয়ভাবে এ বিষয়ে তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নাগরিক সমাজের বক্তব্য সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানালেন, নাগরিকদের দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন তিনি।
বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জের যুগ্ম পরিচালক মিজানুর রহমানের মন্তব্য, প্রকল্পের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক নিজাম পাঠানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রস্তাবিত টার্মিনালের পাশের চৌরঙ্গী বিনোদন পার্ক অপসারণে ১৫ দিনের নোটিস পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন পার্কটির স্বত্বাধিকারী আব্দুস সাত্তার। তিনি জানিয়েছেন, টার্মিনাল নির্মাণের বিরোধী নন তিনি। তবে আলোচনা ছাড়া পার্ক সরানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।



