রায়হান হত্যা মামলায় এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ড, দুজনের যাবজ্জীবন

সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশের বরখাস্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঞাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
এ মামলায় পুলিশের দুই কনস্টেবলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও হারুন অর রশীদ। সাত বছর করে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অপর তিন আসামি হলেন পুলিশের বরখাস্ত সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী, এএসআই হাসান উদ্দিন এবং সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান।
সরকারি কৌঁসুলি জানান, মামলার ছয় আসামির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন কেবল আশেক এলাহী। অন্য পাঁচ আসামি পলাতক রয়েছেন।
রায় নিয়ে ক্ষোভ রায়হানের মায়ের
রায় ঘোষণার দিন দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগারে থাকা আসামি আশেক এলাহীকে আদালতে আনা হয়। এর আগেই আদালতে উপস্থিত হন নিহত রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম।
আসামিদের জামিন পাওয়া এবং তাদের পলাতক থাকার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। রায় ঘোষণার আগে সালমা বেগম বলেছেন, ‘এই রায় শুনে আমি কী করব? আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মেরেছে, তারা তো পালিয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো আসামি জামিন পাননি। কিন্তু ২০২৫ সালে মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর কীভাবে প্রথম তিন আসামি জামিন পেলেন এবং জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে গেলেন, তা তার বোধগম্য নয়।
সালমা বেগম বলেছেন, ‘আজকে তো শুধু কাগজে-কলমে রায় হয়েছে। আসামিরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। আসামিরা শাস্তি না পেলে আমার ছয় বছরের অপেক্ষা আর কষ্ট বিফলে গেল।’
ফাঁড়িতে নির্যাতনের পর মৃত্যু রায়হানের
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। পরদিন ১১ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। তদন্তে নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঘটনার পর এসআই আকবরসহ পুলিশের চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং আরও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে কনস্টেবল হারুনসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত আকবরকে আটক করা হয়।
২০২১ সালের ৫ মে পিবিআই আদালতে ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। আসামিরা হলেন এসআই আকবর হোসেন ভূঞা, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল হারুন অর রশীদ, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস, এসআই হাসান উদ্দিন এবং আবদুল্লাহ আল নোমান। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।
জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক আকবর
আদালত সূত্রের বরাতে জানা যায়, মামলার প্রধান আসামি ও বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক ইনচার্জ এসআই আকবর হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে তার জামিন স্থগিত করা হলেও তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচার ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন রায়হানের পরিবারের সদস্যরা। আদালতের রায়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও আসামিদের অধিকাংশ পলাতক থাকায় তাদের সাজা কার্যকর হওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন নিহতের মা।



