গ্যাস সংকট
হবিগঞ্জে ৮১ শিল্পকারখানার অধিকাংশই বন্ধ
- কর্মহীন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক, বন্ধ অধিকাংশ কারখানা
- দৈনিক চাহিদা ৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট, মিলছে ১৪ মিলিয়ন
- গ্যাসসংকটে বিদেশি ক্রেতাদের রপ্তানি আদেশ বাতিলের শঙ্কা
- চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসসংকট
- আগামী তিন দিনেও সংকট কাটার সম্ভাবনা কম— জেজিটিডিএসএল

ফাইল ছবি
জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে হবিগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ নেমেছে তলানিতে। এতে জেলার ৮১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া রপ্তানি আদেশ নিয়েও শঙ্কায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
গতকাল শুক্রবার সায়হাম গ্রুপের ডেনিমস, কটন, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিলসহ চারটি প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। বিষয়টি জানিয়ে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিএসএল) সঙ্গে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি কোনো প্রতিকার। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে জেলার অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও।
জেজিটিডিএসএলের হবিগঞ্জের শাহজীবাজার কার্যালয়ের আওতাধীন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে থাকা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪২টির সংযোগ ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং ৩৯টি শিল্প শ্রেণির। প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গতকাল সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট। কারখানা চালাতে যেখানে প্রায় ১৩০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ পিএসআই। ফলে অধিকাংশ কারখানায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না উৎপাদন।
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) থেকে প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা দরে গ্যাস কিনে ১৮ পয়সা কমিশনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে জেজিটিডিএসএল। তবে চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে জাতীয় গ্রিডে। এ কারণে জিটিসিএল সিলেট অঞ্চলের শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে জাতীয় গ্রিডে বাড়াচ্ছে সরবরাহ।
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার ডেনিমস, স্কয়ার টেক্সটাইল, সায়হাম গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, বাদশা গ্রুপ, স্টার সিরামিকস, আরএকে সিরামিকস, আকিজ, বেঙ্গল, বিএইচএল, ম্যাটাডোর, তাফরিদ কটন মিলস, ফারইস্ট স্পিনিং ও সিপি বাংলাদেশ। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে দেখা দিয়েছে সংকট। সংকট মোকাবিলায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে সিলেট অঞ্চলের শিল্পকারখানাগুলোতে। কয়েকটি কারখানা নিজস্ব সক্ষমতায় ধীরগতিতে উৎপাদন চালিয়ে গেলেও অধিকাংশই রয়েছে বন্ধ। এতে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান যেমন ঝুঁকিতে পড়েছে, তেমনি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কোম্পানিগুলোর বিদেশি ক্রেতারা।
সরেজমিন শিল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ কারখানার ভেতরে শ্রমিকরা পার করছেন অলস সময়। কর্মকর্তারাও কারখানার বিভিন্ন স্থানে পায়চারি করছেন এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে যোগাযোগ করছেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। বিদেশি ক্রেতাদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তারা। এভাবে সংকট চলতে থাকলে একের পর এক রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, প্রাণ ও আরএফএলে কাজ করেন প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। ২০টি ক্যাটাগরিতে উৎপাদন হয় কয়েক হাজার ধরনের পণ্য। গ্যাস না থাকায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না বিদ্যুৎ। কোনোরকমে চালু রাখা হয়েছে কোম্পানির কার্যক্রম। দ্রুত গ্যাসসংকটের সমাধান না হলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে উৎপাদন।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলছিলেন, ‘বুধবার বেলা ৩টা থেকে গ্যাসের সরবরাহ শূন্য। বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। কারখানা পুরোপুরি শাটডাউন করে দেওয়া হয়েছে। এতে কারখানায় কাজ করা তিন হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অথচ আমাদের প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। বিদেশি ক্রেতারা হতাশ হচ্ছেন। রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যেতে পারে।’
জেজিটিডিএসএলের শাহজীবাজার কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. খালেদ গণি জানালেন, একটি-দুটি নয়, প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুদেবার্তা পাঠিয়ে ও ফোন করে আবেদন জানাচ্ছে কারখানা রক্ষার। কিন্তু চট্টগ্রাম ও ঢাকার সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত কিছু করার নেই তাদের।
আগামী তিন দিনের মধ্যে এই সংকট দূর হবে না আশঙ্কা জানিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আমরা কোনোরকমে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখার চেষ্টা করছি।’
জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুন ভূঁইয়ার ভাষ্য, সবকিছু এখন এলোমেলোভাবে চলছে। সঠিক হিসাব দেওয়া কঠিন। তারপরও বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বড় একটি অংশ সিলেট অঞ্চলে উৎপাদিত হয়।
চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সিলেট অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরবরাহ কমিয়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। আশা করা যায়, শিগগির সংকট নিরসন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে— যোগ করলেন তিনি।







