‘ধান নষ্ট হয়ে গেলে তো সহ্য হয় না, এইজন্য ঈদ টিড মানতেছি না’

ছবি: আগামীর সময়
আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। দিনভর কোরবানির মাংস কাটাকাটি আর বণ্টন শেষে বিকেলটা যখন সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাচ্ছেন, কেউ যাচ্ছেন আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা কেউ মেতেছেন বন্ধুদের আড্ডায়—ঠিক তখনই ফসলের মাঠে অন্য এক জীবনের গল্প। ঈদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসকে একপাশে সরিয়ে রেখে, জীবিকার তাগিদে আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো সোনালি ফসল ঘরে তোলার চিন্তায় ঈদের দিনেও মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার কৃষকদের হাতে শোভা পাচ্ছে কাস্তে।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের দিন বিকেলে সাটুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ফসলের মাঠে গিয়ে দেখা গেল এক ভিন্ন চিত্র। উৎসবের দিনেও মাঠজুড়ে কৃষকদের ধান কাটার ব্যস্ততা। কেউ কাস্তে দিয়ে ধান কাটছেন, কেউ তা আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ সেই ধানের আঁটি মাথায় করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত।
ফুকুরহাটি গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী কৃষক আলীম উদ্দিন কাস্তে হাতে ধান কাটতে কাটতে বললেন, 'ধান নষ্ট হয়ে যায় তা তো সহ্য হয় না। এখন যদি ধান না কাটি তবে একবারে বিনাশ হয়ে যাইবো গা। এই জন্য ঈদ টিড মানতেছি না, ধান রক্ষা করতে ধান কাইটা রোদে দিতে হইবো। কামলা (শ্রমিক) তো দুই-তিন দিন পামু না। এখন নিজে কাইটা রইদ্রে দিতে পারলে রক্ষা, রোদে দিতে না পারলে ধান পইচা যাইবো গা।'
আলীম উদ্দিন জানান, জমিতে পাকা ধান রেখে বাড়িতে তাঁর মন টেকে না। গতকালকের আকস্মিক বৃষ্টি আর বাতাসে তাঁর ৩০ শতাংশ জমিতে বপন করা বোরো ধান মাটিতে পড়ে গেছে। এদিকে ঈদের কারণে আগামী কয়েকদিন কোনো শ্রমিকও পাওয়া যাবে না। তাই বাধ্য হয়েই ঈদের দিনে নিজের ধান রক্ষা করতে মাঠে নেমে পড়েছেন তিনি।
উৎসবের দিনে তাঁকে এভাবে ধান কাটতে দেখে গ্রামের অনেকেই টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, ‘তুমি মরবা না, ঈদের দিনে ধান কাটতেছো?’ আলীম উদ্দিনের সোজাসাপ্টা জবাব—ফসল নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে এছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না।
একই রকম বিপাকে পড়েছেন উপজেলার কান্দাপাড়া গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী কৃষক ফারুক হোসেন। মাঠের এক কোণে ২৫ শতাংশ জমির পড়ে যাওয়া ধান কাটতে কাটতে তিনি জানান, বুধবারের ঝড়-বৃষ্টিতে তাঁর পাকা ধানগুলো মাটিতে শুয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে যদি এই পাকা ধান না কাটা হয়, তবে তা মাটিতে জমে থাকা পানিতে ভিজে একেবারেই নষ্ট হয়ে যাবে।
ফারুক হোসেনের ভাস্য, 'এই ধান কেটে দ্রুত রৌদ্রে শুকাতে হবে। কিন্তু ঈদের কারণে কোনো ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই চরম বিপাকে পরে ধান রক্ষায় ঈদের দিনেও কাজ করতে হচ্ছে।'
সাটুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমি। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে এবার ৫ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। বাম্পার ফলন হলেও ঈদের আগের দিনের আকস্মিক আবহাওয়ার বৈরিতা আর শ্রমিক সংকটের কারণে উৎসবের দিনেও সাটুরিয়ার কৃষকদের আনন্দ রূপ নিয়েছে ফসলের মাঠের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে।






