বরগুনায় ঋণের চাপে মা ও দুই মেয়ের মৃত্যু, ধারণা পুলিশের

ছবি: আগামীর সময়
বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলায় মা ও দুই মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে। চার লাখ টাকার বেশি ঋণ, সংসারের আর্থিক অনটন ও কিস্তি পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে ইতি রানী বিশ্বাস (৩৪) প্রথমে তার দুই মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাসকে (৩) হত্যা করেন, পরে নিজে আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে পুলিশ। যদিও বাদীর দাবি পরিকল্পিত হত্যা।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানান বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খান।
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলার তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে ইতি রানী ও তার দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ওই দিন সকালে ইতি রানী দুই মেয়েকে নিয়ে ডাকবাংলায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে যান। এ ঘটনায় ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্যে সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
ডাকবাংলার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইতি রানী দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে তারা তৃতীয় তলায় যান। সকাল ১০টা ৫০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে বড় মেয়ে আরাধ্যা ৩ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পর ইতি রানী ছোট মেয়ে অনুরাধাকে ৪ নম্বর কক্ষে রেখে ৩ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন।
ফুটেজ অনুযায়ী, প্রায় ২২ মিনিট পর সকাল ১১টা ১৩ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে ইতি রানী ৩ নম্বর কক্ষ থেকে বেরিয়ে ১১টা ১৩ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ৪ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর তাদের কাউকেই জীবিত অবস্থায় কক্ষ থেকে বের হতে দেখা যায়নি।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এ সময়ের মধ্যে ইতি রানী দুই মেয়েকে কোমল পানীয় অথবা খাবার পানির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে পান করানোর পর শ্বাসরোধে হত্যা করে থাকতে পারেন। পরে নিজেও চেতনানাশক ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করেন বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্যে ময়নাতদন্তে যা বলছেন চিকিৎসকেরা
তিনজনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চিকিৎসকদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। ইতি রানীর মৃত্যুর বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার মৃত্যু হয়েছে ‘বেঞ্জোডায়াজেপিন’ জাতীয় রাসায়নিকের বিষক্রিয়ায় এবং তা আত্মহত্যাজনিত।
অন্যদিকে, আরাধ্যা ও অনুরাধার মৃত্যুর কারণ হিসেবে একই ধরনের রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার পাশাপাশি আঘাতজনিত শ্বাসরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মৃত্যু হত্যাজনিত বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। তবে তিনজনের কারও ক্ষেত্রে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চার লাখ টাকার বেশি ঋণ
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস পেশায় সুপারি ব্যবসায়ী ও দর্জি। তার ছোট টেইলারিং দোকান এবং সীমিত পরিসরের সুপারি ব্যবসা থেকে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন ছিল। তাদের পুরোনো বসতভিটা প্রায় ৩০ বছর আগে নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে তারা সরকারি জায়গায় বসবাস করছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইতি রানী পাঁচটি এনজিও থেকে মোট ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা এবং দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এ ছাড়া অনিল রায় ও বাবুল রায়ের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নেন তারা। সব মিলিয়ে তাদের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা।
তদন্তে বলা হয়েছে, ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে ইতি রানী মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগতেন। সংসারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ও স্বামীকে সহযোগিতার জন্য মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনে বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগ দেন তিনি। পারিবারিক আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপ তাঁর হতাশার অন্যতম কারণ ছিল বলে মনে করছে পুলিশ।
মামলার বাদী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, 'ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আমরা এখনো হাতে পাইনি। তাতে কী লেখা এসেছে, তাও জানি না। ঋণের কারণে আমার স্ত্রী দুই সন্তানকে মেরে ফেলবে, তা হতে পারে না। আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চাই।'
বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খান জানিয়েছেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার আলামত, সাক্ষ্যপ্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছেন। খুব শিগগিরই আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।




