বিদেশি ফলে বদলে যাচ্ছে জীবননগরের কৃষকের ভাগ্য

জীবননগরে ধান, পাট ও ভুট্টার পাশাপাশি চাষ হচ্ছে অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, আনারকলি ও আঙুরের মতো ফল
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ধান, পাট ও ভুট্টার পাশাপাশি চাষ হচ্ছে অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, আনারকলি ও আঙুরের মতো ফল। এসব বিদেশি ফল চাষ করে অনেক কৃষক এখন ভালো আয় করছেন। ১৫ বছর আগে জীবননগরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয় এই চাষ। এখন এটি বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের সাফল্যে এলাকায় বিদেশি ফল চাষের আগ্রহও বাড়ছে।
জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ড্রাগন ৬৮৮ হেক্টর, পেয়ারা ৭৪৮ হেক্টর, মাল্টা ৩১২ হেক্টর, কমলা ১২০ হেক্টর, আঙুর ৯ হেক্টর, রকমেলন ৬ হেক্টর, অ্যাভোকাডো ৪ হেক্টর, আনারকলি ২ হেক্টর, শরিফা ১ হেক্টর, আনার ০.৫০ হেক্টর, বারোমাসি কাঁঠাল ০.৫০ হেক্টর ও রাম্বুটান ০.১৩ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জীবননগরের উর্বর পলিমাটিতে এসব ফলের চাষে খরচ কম এবং ফলন ভালো। চাহিদা থাকায় বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যায়। জীবননগরের বাগানের ফল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অনন্তপুর গ্রামের কৃষক আকশেদ আলী পরীক্ষামূলকভাবে আনারকলি চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। তিনি দীর্ঘ ১০ বছর ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউটিউবে ভিডিও দেখে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের আদি ফল আনারকলির চারা সিরাজগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করেন।
জিনি জানান, জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণের পর নিয়মিত সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেন। ছয় মাসের মধ্যেই গাছে ফুল আসে। ফল ধরে রাখতে ও পচন ঠেকাতে বাঁশের খুঁটি ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করেন। আগস্টের শুরু থেকে ফল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এসব ফল ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।
রাজাপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সজল আহমেদ ২০১৪ সালে ৯ বিঘা পেয়ারা বাগান দিয়ে শুরু করেন। এখন তার প্রায় ১৪০ বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে মরক্কো, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন জাতের মাল্টা ৪০ বিঘা, বিভিন্ন জাতের আম ৩৫ বিঘা এবং ড্রাগন, কমলা, আঙুর ও অ্যাভোকাডোসহ প্রায় ২০ ধরনের বিদেশি ফল রয়েছে।
সজল আহমেদ জানালেন, পেয়ারা চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় ২০১৪ সালে মাল্টা চাষে মন দেন। শুরুতে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি ও ফলন বাড়তে থাকে। বর্তমানে সাধারণ সবুজ মাল্টার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ইয়েলো কিংসহ প্রায় ১০ জাতের মাল্টা চাষ করছেন তিনি।
তার বাগান ঘিরে গড়ে উঠেছে ‘বিসমিল্লাহ নার্সারি ও ফলের বাগান’। চাষ পদ্ধতি দেখতে ও শিখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা সেখানে আসেন।
উথলী গ্রামের আশরাফুজ্জামান মিলু ২০১০ সাল থেকে ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করছেন। বর্তমানে তার ২২ বিঘা জমিতে ড্রাগন, ৬ বিঘায় মাল্টা এবং ১০ বিঘায় পেয়ারা রয়েছে। তিনি প্রাকৃতিকভাবে ফল চাষ করেন।
একই গ্রামের রাজু আহমেদ ১৬ বছর ধরে ফল চাষ করছেন। ২০১০ সালে আপেল কুল দিয়ে শুরু করে পরে থাই পেয়ারা, মাল্টা ও ড্রাগন চাষে যুক্ত হন। তিনি বললেন, এক বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করে বছরে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব।
হাসাদাহ গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা দুই ভাই আশরাফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলামও বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে তারা পার্পেল ও বাইকুনুর জাতের প্রায় ৭৫০টি আঙুরগাছ লাগিয়েছেন। বাগান থেকে তারা ভালো আয় করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবননগরের এসব বাগানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন দর্শনার্থী আসছেন। স্থানীয়দের পাশাপাশি যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর এমনকি ঢাকা থেকেও অনেকে বাগান দেখতে আসছেন।
স্থানীয় দর্শনার্থী হাসান নিলয় বলেছেন, আগে টেলিভিশন ও ইউটিউবে এসব ফল দেখেছেন। এখন নিজের এলাকার বাগানে সেগুলো কাছ থেকে দেখতে পারছেন।
আরেক দর্শনার্থী হাসিবুল ইসলাম জানান, বিদেশি ফলগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও সুস্বাদু। তাই তারাও এমন বাগান করার কথা ভাবছেন।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেছেন, বিদেশি ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। জীবননগরের মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এসব ফলের চাষ সফল হচ্ছে। কৃষকরা লাভবান হওয়ায় আগ্রহ আরও বাড়ছে। এর ফলে কৃষকদের নতুন আয়ের পথ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ফলের আমদানি নির্ভরতাও কমতে পারে।




