বাঁকখালীতে সম্প্রীতির মিলনমেলা

ছবি: আগামীর সময়
আকাশ জুড়ে রঙিন ফানুসের আলো, বাঁকখালী নদীতে ভাসছে সাতটি বর্ণিল কল্পজাহাজ। ঢোল, কাঁসর ও মন্দিরার তালে শিশু-কিশোর থেকে তরুণ-তরুণীদের নাচ-গান। মাইকে বৌদ্ধ কীর্তন, নদীর দুই পাড়ে উৎসবমুখর মানুষের উচ্ছ্বাস। ধর্মীয় ঐতিহ্য, আনন্দ আর সম্প্রীতির এমন বর্ণিল আয়োজনে মুখর হয়ে উঠেছে কক্সবাজারের রামু।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব এখন পরিণত হয়েছে নানা ধর্মের মানুষের মিলনমেলায়।
আজ সোমবার বিকালে রামুর বাঁকখালী নদীর চরে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। পূর্ব রাজারকুল, হাজারীকুল, হাইটুপী রাখাইনপাড়া, হাইটুপী বড়ুয়াপাড়া, দ্বীপ-শ্রীকুল, জাদিপাড়া ও মেরংলোয়া গ্রাম থেকে সাতটি কল্পজাহাজ নদীতে ভাসানো হয়। সাত-আটটি নৌকার ওপর বাঁশ, বেত, কাঠ ও রঙিন কাগজ দিয়ে তৈরি প্রতিটি জাহাজের কারুকাজ সহজেই দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
প্রতিটি কল্পজাহাজে ছিল একাধিক মাইক। ঢোল, কাঁসর ও মন্দিরার তালে জাহাজের ওপর শিশু-কিশোর ও তরুণরা নেচে-গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন। নদীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জাহাজ ভেসে চলার সময় মাইকে চলতে থাকে বৌদ্ধ কীর্তন ও নানা আনন্দ আয়োজন। এর আগে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা থেকে রামুর আকাশে উড়তে দেখা যায় শত শত দৃষ্টিনন্দন ফানুস।
উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাহাজভাসা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিপ্লব বড়ুয়া। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সুকোমল বড়ুয়া। প্রধান আলোচক ছিলেন কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ লুৎফুর রহমান কাজল।
জাহাজভাসা উদযাপন পরিষদের সমন্বয়ক অর্পণ বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক দয়াল বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান, রামু থানার ওসি এ কে ফজলুল হক এবং রামুর রাংকোট বৌদ্ধ বিহারের পরিচালক জ্যোতিসেন মহাথের। এ ছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি, বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতারাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেছেন, আমরা সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ এক। পাহাড় ও সমতলের সব মানুষ এক। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই।
উৎসবে যোগ দিতে চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন সুস্মিতা বড়ুয়া। তিনি বললেন, নিজ এলাকায় প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্যাপন শেষে কল্পজাহাজ ভাসানোর আনন্দে অংশ নিতে রামুতে চলে এসেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন্দনী বড়ুয়ার ভাষ্য, কল্পজাহাজ ভাসা আমাদের প্রাণের উৎসব। এ উৎসব বৌদ্ধদের হলেও প্রতিবছর এটি অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
মেরোংলোয়া কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানালেন, প্রায় ২০০ বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের প্রচলন হয়। দেশটির মুরহন ঘা নামের একটি স্থানে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবের আয়োজন করেন বলে তিনি জানালেন।
উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরে প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহামতী গৌতম বুদ্ধের রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময় নাগলোকের নাগেরা তাকে পূজা করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। সে সময় ৫০০ নাগরাজ তাদের ঋদ্ধিময় ফণা বুদ্ধ ও ৫০০ ভিক্ষুর মাথার ওপর বিস্তার করেছিলেন। সেই ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের স্মরণেই কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের আয়োজন করা হয়।
স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে উদ্যাপিত এ উৎসব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক আয়োজনের রূপ পেয়েছে। প্রতিবছর কল্পজাহাজ ভাসাকে কেন্দ্র করে বাঁকখালী নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। ফানুসের আলো, কল্পজাহাজের বর্ণিল সাজ আর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রামুর এ আয়োজন হয়ে উঠেছে ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সৌহার্দ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক।




