‘স্বামী-পোলা মইরা গেছে, গোস্ত খাওয়াইবে কেডা’

ছবি: আগামীর সময়
চারদিকে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ। ঘরে ঘরে চলছে মাংস কাটার ব্যস্ততা, বাতাস ভেসে আসছে রান্নার চেনা ঘ্রাণ। কিন্তু উৎসবের এই চিরন্তন আবহের মধ্যেও বুকভরা কষ্ট আর চোখে ক্লান্তি নিয়ে পটুয়াখালীর বাউফলের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সত্তর ছুঁইছুঁই বৃদ্ধা তারা বানু। হাতে একটি ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগ। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি—কয়েক টুকরো মাংসের আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন তিনি।
বাউফল সরকারি কলেজের সামনে যখন তার সঙ্গে দেখা হলো, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জীবনের সব না-বলা দীর্ঘশ্বাস এক বাক্যে উগরে দিয়ে এই বৃদ্ধা বললেন, 'স্বামী-পোলা মইরা গেছে, গোস্ত খাওয়াইবে কেডা।'
পটুয়াখালীর বাউফল সদর ইউনিয়নের গোসিংগা ফকির বাড়ির এই বাসিন্দা যেন এক জীবন্ত দুঃখের আখ্যান। প্রায় ৪০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন তারা বানু। এরপর বুক খালি করে মাত্র ২ বছর বয়সে ছোট ছেলে জুয়েল মারা যায় পুকুরে ডুবে। সেই গভীর শোক বুকে পাথর বেঁধে সয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুরতা এখানেই শেষ হয়নি। পাঁচ বছর আগে লিভারের রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার বড় ছেলে মঞ্জু ফকিরও।
বড় ছেলের মৃত্যুর পর যেন পুরো আকাশটাই ভেঙে পড়ে তারা বানুর মাথায়। মৃত ছেলে মঞ্জুর রেখে যাওয়া ৪ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে এখন তারা বানুর বেঁচে থাকার চরম লড়াই। নাতি-নাতনি সাগর (১৭), সোহাগ (১৪), সোহাগী (১৪), ওসমান (১২) ও ছোট্ট জাকারিয়া (৫)—কেউই এখনো প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি। অভাবের তীব্র কষাঘাতে বন্ধ হয়ে গেছে ওদের পড়াশোনা। দুই নাতি ছোটখাটো কাজ করে সংসারে সামান্য সাহায্য করার চেষ্টা করলেও পরিবারটিতে স্থায়ী কোনো উপার্জনক্ষম মানুষ নেই। ফলে এই বৃদ্ধ বয়সেও সংসার চালাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয় তারা বানু এবং তার বিধবা পুত্রবধূ নাজমাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বড় ছেলে মঞ্জু বেঁচে থাকতে অটোরিকশা চালিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে সংসার চালাতেন। কিন্তু তার অকালমৃত্যুর পর পরিবারটি সম্পূর্ণ অথর্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছে। এখন সমাজের সহানুভূতি আর মানুষের দেওয়া সাহায্যই তাদের একমাত্র ভরসা।
ঈদের দিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাউফলের বিভিন্ন মানুষের বাড়ি ঘুরে মাত্র ২-৩ কেজি মাংস জোগাড় করতে পেরেছেন তারা বানু। ক্লান্ত চোখে একটু হাসার চেষ্টা করে তিনি বললেন, 'সারা বছর তো এক টুকরা গোস্তও খাইতে পারি না। এই ঈদের দিনটার লাইগাই বইসা থাকি। মানুষ যা দেয়, তাই নিয়া নাতিগো লইয়া রান্না কইরা খামু। আর একটু অন্যের ফ্রিজে রাইখা দিমু পরে খাওনের লাইগা।'
সবার ঘরে যখন ঈদের আনন্দ মানে নতুন জামাকাপড় আর বিপুল উৎসব, তখন তারা বানুর ভাঙা ঘরে ঈদের আনন্দ মানে মানুষের দুয়ার থেকে চেয়ে আনা কয়েক কেজি মাংস আর নাতিদের মুখে একবেলা ভালো খাবার তুলে দিতে পারার যৎসামান্য শান্তি।






