ঐতিহাসিক জমিদারবাড়িটি এখন গরু-ছাগলের চারণভূমি

একসময় জমিদার পরিবারের সদস্যদের পদচারণায় মুখর থাকত ভবনের চারপাশ। এখন সেখানে অবাধে ঘুরে বেড়ায় গরু-ছাগল। ছবি: আগামীর সময়
দরজা-জানালার কপাট নেই, নেই কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা বা সংরক্ষণের উদ্যোগ। একসময় জমিদার পরিবারের সদস্যদে পদচারণায় মুখর প্রসাদের চারপাশে এখন অবাধে ঘুরে বেড়ায় গরু-ছাগল। ইট খুলে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন অংশ থেকে। আবার দোতলার কক্ষে পোড়ানো হচ্ছে শুকনো পাতাও।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের শতবর্ষী জমিদারবাড়িটি এখন ধ্বংসের মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত ভবনটি এখন পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আড্ডাখানায়ও।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের দ্বিতল এই ভবনটি। একসময় এলাকার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা ছিল এটি। বর্তমানে ভবনের প্রধান ফটক, দরজা ও জানালার কাঠামো থাকলেও নেই কপাট। সীমানাপ্রাচীর প্রায় বিলীন। চারপাশে ঝোপঝাড়, ময়লা-আবর্জনা ও গবাদিপশুর বিচরণে অনেকটাই হারিয়ে গেছে ভবনটির ঐতিহাসিক সৌন্দর্য।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভবনের নিচতলা থেকে ছাদের বেষ্টনী পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে ইট খুলে নেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গার গাঁথুনি নষ্ট হয়ে পড়েছে। দোতলার একটি কক্ষে শুকনো পাতা ও কাগজ পোড়ানোর চিহ্ন রয়েছে। ছাদের নিচে এখনো ব্রিটিশ আমলের লোহার গার্ডার টিকে আছে। ইট, সুরকি ও রডের সমন্বয়ে নির্মিত ভবনটিতে ১৪টি কক্ষ রয়েছে। দেয়াল ও ছাদজুড়ে এখনো প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর নানা নিদর্শন দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভবনটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় সেখানে প্রায় প্রতিদিনই কিছু তরুণ ও যুবকের আড্ডা বসে। সেখানে মাদক সেবন করেন অনেকেই। সন্ধ্যার পর নিরাপত্তার শঙ্কায় সাধারণ মানুষ ভবনের আশপাশে যেতে ভয় পান। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হলেও নেওয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা ।
খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রউফ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ব্রিটিশ আমলে ভারতের বাঁকুড়ার জমিদার প্রমোদ চন্দ্র মুন্সি খাজনা আদায়ের জন্য রাজকুমার সরকারকে বিরামপুরে পাঠান। পরে ১৯৩৫ সালে তিনি বিভিন্ন মৌজায় জমির বন্দোবস্ত নিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে এই জমিদারবাড়ি নির্মাণ করা হয়। ১৯৪৫ সালে তার মৃত্যুর পর ছেলে রুক্ষনি কান্ত সরকার জমিদারির দায়িত্ব নেন
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে রুক্ষনি কান্ত সরকার স্ত্রী কণিকা রানি সরকারকে নিয়ে ভারতে চলে যান। ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে জমির হিসাব সরকারের কাছে জমা দিয়ে আবার ভারতে ফিরে যান। পরে জমির একটি অংশ অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৭৪ সাল থেকে ভবনটি খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয় এবং ১৯৮০ সাল থেকে ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালে নতুন ভূমি অফিস নির্মাণের পর এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই ভবনটির অবক্ষয় দ্রুত বাড়তে থাকে।
মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মেজবাউল হক বলেছেন, ভবনটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তবে ভেতরের পরিবেশ নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ। সংস্কার করা হলে এটি শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত হতে পারে।
খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চিত্ত রঞ্জন পাহান জানিয়েছেন, এটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, রতনপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই অঞ্চলের ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২০ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে সংরক্ষণ ও সংস্কারের আবেদন পাঠানো হয়েছিল। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সরেজমিনে পরিদর্শনও করেন। তবে এখনো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমোদন না পাওয়ায় সংস্কারকাজ শুরু করা যায়নি।
বিরামপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম সরকার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জমিদারবাড়িতে কিছু ব্যক্তির, বিশেষ করে স্থানীয় আদিবাসী তরুণদের আনাগোনার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





