হৃদপিণ্ডে ছিদ্র, ৫ লাখ টাকা হলেই বেঁচে যাবে ছোট্ট হযরত আলী

ছবি: আগামীর সময়
ছোট্ট শিশু কাঁদছে। যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তাকে কোলে নিয়ে কখনো মা, কখনো বাবা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কান্না থামছে না। কারণ তার হৃদযন্ত্রে রয়েছে দুটি ছিদ্র। চিকিৎসার প্রয়োজন, কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ জোগাড় করার সামর্থ্য নেই পরিবারের। সন্তানের কষ্ট চোখের সামনে দেখেও অসহায় বাবাকে শুধু তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, ৫ লাখ টাকা হলেই বেঁচে যাবে ছোট্ট শিশুটি।
শুধু ছোট সন্তানটিই নয়—আরেক সন্তান জন্ম থেকেই হাঁটতে পারে না। আর এই দুই অসুস্থ সন্তানের বাবা এজাজুল ইসলাম নিজেও কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। তবু পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রতিদিন কাজে ছুটতে হয় তাকে। কখন নিজের শরীর ভেঙে পড়ে, সেই চিন্তা করারও যেন সুযোগ নেই তার।
এজাজুল ইসলামের বয়স মাত্র ২৫ বছর। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ধুলিরাম বানিয়াপাড়া এলাকার নাড্ডা মিয়ার ছেলে তিনি। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ২০১৭ সালে কাজের সন্ধানে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এসেছিলেন। কালিয়াকৈরে এসে সাদমা ফ্যাশনে আয়রনম্যান হিসেবে কাজ নেন এজাজুল। সামান্য আয় হলেও স্ত্রীকে নিয়ে ছোট্ট সংসারটি ভালোই চলছিল। এরপর একে একে পরিবারে আসে তিন সন্তান—ফাহিম (৮), হোসাইন (৪) ও হযরত আলী (৮ মাস)।
প্রথম সন্তান ফাহিমকে নিয়ে ছিল অনেক স্বপ্ন। তাকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন—এটাই ছিল বাবার আশা। কিন্তু সংসারের অভাব আর একের পর এক বিপদ সেই স্বপ্নেও আঘাত করেছে।
দ্বিতীয় সন্তান হোসাইন জন্মের পর থেকেই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না। ছোট্ট ছেলেটিকে সুস্থ করে তুলতে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছেন বাবা-মা। কিন্তু দীর্ঘদিন চিকিৎসা করিয়েও তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। তারপরও আশা ছাড়েননি এজাজুল ও তার স্ত্রী। ভেবেছিলেন, তৃতীয় সন্তানটি হয়তো তাদের সংসারে নতুন আনন্দ নিয়ে আসবে। কিন্তু সেই শিশুটিই এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হযরত আলীর বয়স এখন মাত্র ৮ মাস। জন্মের প্রায় এক থেকে দেড় মাস পর হঠাৎ ঠাণ্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হয় সে। দ্রুত তাকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করেন বাবা-মা। সেখানে চিকিৎসকরা শিশুটির হৃদ্যন্ত্রে সমস্যার আশঙ্কা করেন। পরে তাকে হার্ট ফাউন্ডেশনে রেফার করা হয়। হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা নেওয়ার পর সেখান থেকেও তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, ছোট্ট হযরত আলীর হৃদযন্ত্রে দুটি ছিদ্র রয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে রক্ত ফুসফুসে গিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করছে। এর প্রভাবে শিশুটি প্রায়ই অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ে।
শিশুটির কান্না যেন এখন এজাজুলের পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী। কখনো কোলে নিয়ে, কখনো বুকে জড়িয়ে, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে সন্তানকে শান্ত করার চেষ্টা করেন বাবা-মা। কিন্তু সন্তানের যন্ত্রণা কমে না। আর তখনই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান বাবা এজাজুল। কারণ তিনি জানেন—সন্তানের চিকিৎসা দরকার। কিন্তু সেই চিকিৎসার টাকা তার হাতে নেই।
একজন বাবার কাছে সন্তানের কান্নার চেয়ে অসহায় দৃশ্য আর কী হতে পারে? ছোট্ট হযরত আলী যখন যন্ত্রণায় কাঁদে, তখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও সব সময় থাকে না। চিকিৎসার খরচ, ওষুধের খরচ—সবকিছু মিলিয়ে যেন অসহায় হয়ে পড়েছেন এই বাবা।
বর্তমানে এজাজুল স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ইউনিয়নের রাখালিয়াচালা এলাকায় কালামের বাসায় ভাড়া থাকেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এজাজুল ইসলাম বললেন, আমি আমার বাচ্চার কান্না সহ্য করতে পারছি না। আমার চোখের সামনে আমার সন্তান কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা করাতে পারছি না। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?
তার ভাষ্য, আমার বড় ছেলের লেখাপড়ার খরচও আমি বহন করতে পারছি না। আমার আরেক সন্তান জন্ম থেকেই হাঁটতে পারে না। ছোট সন্তানটির হার্টে দুটি ছিদ্র। তার ওপর আমিও কিডনির সমস্যায় ভুগছি। কিন্তু নিজের চিকিৎসা করানোরও সামর্থ্য নেই।
সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার অনুরোধ আমার পরিবারের দিকে একটু তাকান। আমার সন্তানদের চিকিৎসা করানোর সুযোগ করে দিন। যদি আমাকে একটু সহযোগিতা করা হয়, তাহলে আমি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, পরিবারে যদি কোনো প্রতিবন্ধী সদস্য থাকেন এবং তিনি সরকারি ভাতার জন্য যোগ্য হন, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পরিবারটির অন্য কোনো ধরনের আর্থিক বা চিকিৎসাসংক্রান্ত সহায়তার প্রয়োজন হলে তারা উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এককালীন আর্থিক সহায়তা কিংবা চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।







