আঙুর ফল টক নয়, মিষ্টি আঙুরে সফল সবুজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় অনেকেই বলতেন, পঞ্চগড়ে আঙুর চাষ সম্ভব নয়। কেউ কেউ হাসতেন, কেউ আবার স্বপ্নবিলাসী বলে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু সেই সব কথাকে ভুল প্রমাণ করে আজ মিষ্টি আঙুরের সফল চাষি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন পঞ্চগড়ের তরুণ আল ফারুক সবুজ। বাড়ির একটি ছোট ছাদে শুরু হওয়া তার আঙুর চাষ এখন আশপাশের মানুষের অনুপ্রেরণার নাম।
পঞ্চগড় পৌর এলাকার নতুনবস্তি রাজনগরের বাসিন্দা সবুজ। স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই বেছে নেন জীবনের পথ হিসেবে। তবে প্রচলিত ফসল নয়, তিনি বেছে নেন আঙুর চাষের মতো চ্যালেঞ্জিং একটি ক্ষেত্র। শুরুটা হয়েছিল বাড়ির ল্যাট্রিনের ছাদে কয়েকটি আঙুরের চারা লাগানোর মধ্য দিয়ে।
প্রথম দিকে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয় তাকে। আর্থিক সংকট, পারিবারিক দায়বদ্ধতা, বেকারত্বের চাপ এবং মানুষের কটূক্তি কোনো কিছুই তার পথচলা থামাতে পারেনি। প্রায় তিন বছর ধরে গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি পঞ্চগড়ের মাটিতে মিষ্টি আঙুর উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেন।
বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে ট্রান্সফিগারেশন, ডেভুস্কি পিংক, ফ্লেমিংক, গোল্ডেন সাইন মাস্কাট, জুপিটার, ভাইকিং-টু, একাডেমিক, ভ্যালেজ, বাইকুনুর, একেলো, ডিক্সন, সুলতানা, কিসমিস রেবেকা, ব্ল্যাক ম্যাজিক, এলব্রুস, জুলিয়ান, ব্ল্যাক ফিঙ্গার, ইনটু বি-টু এবং ব্ল্যাক রুবিসহ প্রায় ২০টি জাতের আঙুর।
সবুজের ছাদবাগান এখন দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিনই অনেকে সেখানে গিয়ে আঙুর দেখছেন, স্বাদ নিচ্ছেন এবং চারা সংগ্রহ করছেন। এ বছর তার বাগানে ১০০ কেজিরও বেশি আঙুর উৎপাদন হয়েছে। প্রতি কেজি আঙুর ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি। পাশাপাশি নিজ হাতে তৈরি করা কলম ও চারা বিক্রি করেও আয় করছেন।
সবুজের স্বপ্ন শুধু নিজের সফলতায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আঙুর চাষ ছড়িয়ে পড়ুক। তার বিশ্বাস, সঠিক পরিচর্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
সবুজ বলেছেন, ‘আমরা প্রতিবছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ আঙুর আমদানি করি। অথচ আমাদের দেশেও উন্নত জাতের মিষ্টি আঙুর উৎপাদন সম্ভব। আমি চাই তরুণরা কৃষিকে নতুনভাবে দেখুক এবং আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠুক।’
তার এই সফলতায় খুশি পরিবার ও প্রতিবেশীরাও। শুভাকাঙ্ক্ষী আল মামুন বলেছেন, ‘সবুজ ছাত্রজীবন থেকেই ব্যতিক্রম কিছু করার স্বপ্ন দেখত। আজ তার সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়েছে। সে শুধু নিজে সফল হয়নি, অনেক তরুণকে অনুপ্রাণিত করছে।’
ছোট ভাই নিলয় হাসান বলেছেন, ‘ভাইয়ের কৃষির প্রতি ভালোবাসা দেখে আমি নিজেও উৎসাহ পাই। তার সফলতা প্রমাণ করেছে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবও সম্ভব।’
প্রতিবেশী মনির জানান, আগে ভাবতাম আঙুর চাষ শুধু বিদেশেই সম্ভব। এখন সবুজের বাগান দেখে আমিও আঙুরের চারা নিয়েছি। নিজেও চাষ শুরু করতে চাই।
পঞ্চগড়ে কর্মরত লালমনিরহাটের শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘আগে কয়েকবার চেষ্টা করেও সফল হইনি। পরে সবুজের কাছ থেকে চারা নিয়ে তার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ শুরু করেছি। তার বাগানের আঙুর খেয়ে বুঝেছি, পঞ্চগড়েও মিষ্টি আঙুর ফলানো সম্ভব।’
কৃষি বিভাগও সবুজের উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পঞ্চগড়ের উপপরিচালক মো. আব্দুল মতিন বলেছেন, ‘পঞ্চগড়ের মাটি ও আবহাওয়া বহুমুখী কৃষির জন্য উপযোগী। আঙুর চাষে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে আমরা কাজ করছি।’
একসময় যে তরুণকে অনেকে স্বপ্নবিলাসী বলেছিলেন, আজ সেই সবুজই হয়ে উঠেছেন সম্ভাবনার প্রতীক। তার ছাদবাগানের থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা আঙুর যেন শুধু একটি ফল নয়, বরং সংগ্রাম, অধ্যবসায় আর সফলতার এক মিষ্টি গল্প।









