শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে ৮৮ লাখ টাকা, জমা থাকবে ব্যাংকে

ছবি: আগামীর সময়
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স ও ডেগে পঞ্চম দফায় গণনায় পাওয়া গেছে ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকা। এ নিয়ে পাঁচ দফায় মাজারের দানবাক্স ও ডেগে পাওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৮ লাখ ২৩ হাজার ৯১ টাকা। তবে দানের অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজে এবং বাকি ৬৫ শতাংশ দৈনন্দিন খরচ ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয়ের আগের সিদ্ধান্ত এখনই কার্যকর হচ্ছে না।
আপাতত সব অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মাজার ব্যবস্থাপনায় গঠিত কমিটির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দানবাক্স ও ডেগের টাকা গণনা শুরু হয়।
দিনভর গণনা শেষে পাওয়া অর্থের পরিমাণ জানানো হয় ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকা। এ সময় নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণ, রুপা ও বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া যায়।
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, আজ শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে পাওয়া টাকা আগের মতোই ব্যাংক হিসাবে রাখা হবে। এখান থেকে বিদ্যুৎ বিলসহ কিছু ইউটিলিটি বিল দেওয়া হবে। আনসারের বেতন দেওয়া হবে।
তিনি জানালেন, আমরা তিনজন লোক নিয়োগ দেব—ম্যানেজার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কম্পিউটার অপারেটর। তখন টাকার ৬৫ শতাংশ দিয়ে মাজারের দৈনন্দিন খরচ ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেছেন, এসব পদে নিয়োগ সম্পন্ন হতে আরও মাসখানেক লাগতে পারে। নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে আরও একবার তাদের ব্যবস্থাপনায় টাকা গণনা হতে পারে। এরপর প্রতিদিন দানবাক্সের টাকা গণনার ব্যবস্থা করা হবে।
দানের অর্থ বণ্টন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেছেন, উচ্চপর্যায়ের কমিটি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করেই অর্থ বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাজার পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য ব্যয় রয়েছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাঁচ দফায় নগদ অর্থ ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় মাজারের দানবাক্স ও ডেগে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। দ্বিতীয় দফায় পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০০ টাকা, তৃতীয় দফায় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা এবং চতুর্থ দফায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। পঞ্চম দফায় পাওয়া গেছে ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৪ টাকা। এ হিসাবে পাঁচ দফায় পাওয়া নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯১ টাকা।
পঞ্চম দফার গণনায় পাওয়া মূল্যবান সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১ ভরি সাড়ে ৮ আনা স্বর্ণ, ৩ ভরি ১৩ আনা রুপা, ৭ হাজার ৬৪৭ ভারতীয় রুপি ও ১৪ পাউন্ড। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে।
টাকা গণনার কার্যক্রমে মাজারের কর্মকর্তা, ব্যাংকের প্রতিনিধি ও বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী অংশ নেন। গণনা শেষে সংগৃহীত অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মাজারের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখার কথা জানানো হয়েছে।
৩৫ শতাংশ উন্নয়নকাজে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত
এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে গঠিত কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজের জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখা হবে। বাকি ৬৫ শতাংশ ব্যয় করা হবে মাজারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়।
সেদিন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির সভা শেষে এসব তথ্য জানিয়েছিলেন কমিটির সদস্যসচিব ও সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উন্নয়নকাজের জন্য নির্ধারিত ৩৫ শতাংশ অর্থের ব্যাংক হিসাবটি জেলা প্রশাসক ও মাজারের মোতোয়াল্লির যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার কথা। অর্থ গণনা ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একজন ব্যবস্থাপক, একজন হিসাবরক্ষক ও একজন অফিস সহকারী নিয়োগের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। ব্যবস্থাপক হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা অথবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া মাজারের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখভালের জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। জেলা প্রশাসক এ কমিটির আহ্বায়ক থাকবেন।
কমিটিতে সিলেট সিটি করপোরেশন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট মহানগর পুলিশ, সিলেট জেলা পরিষদ ও পুলিশ সুপারের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। মাজারের মোতোয়াল্লি সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন।
যেভাবে শুরু হয় প্রকাশ্যে টাকা গণনা
মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের পর গত ২৩ জুন আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
এর আগে গত ১৮ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগে মাজারের পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে মাজারে দান করা নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি ডেগও সিলগালা করা হয়। এ নিয়ে সিলেটে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যে ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। পরদিন তাঁর উপস্থিতিতে দানবাক্সের তালা খুলে জনসমক্ষে টাকা গণনা করা হয়।
এরপর থেকে নির্দিষ্ট বিরতিতে দানবাক্স ও ডেগে জমা হওয়া অর্থ প্রকাশ্যে গণনা করা হচ্ছে। সর্বশেষ শনিবার পঞ্চম দফার গণনা সম্পন্ন হয়।



