যশোরে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে বাড়ছে প্রাণহানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রেললাইনের ওপর দিয়ে প্রতিদিন ছুটে চলে ট্রেন। একই লাইন পার হন হাজারো মানুষ। কোথাও নেই গেটবার, কোথাও নেই গেটম্যান। আবার কোথাও ট্রেন আসার সংকেত পেতে গেটম্যানদের নির্ভর করতে হয় মোবাইল ফোনের ওপর। ফলে সামান্য অসতর্কতা কিংবা যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটলেই ঝরছে প্রাণ। গত এক দশকে যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর ও যশোর-খুলনা রেলপথে ৪৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৫ জন। আহত ও পঙ্গু হয়েছেন অনেকে। অরক্ষিত রেলক্রসিং ঘিরে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়লেও রেলওয়ে ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মধ্যে সমন্বয়হীনতায় হচ্ছে না স্থায়ী সমাধান।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার কৃষ্ণবাটি এলাকায় ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ইজিবাইকচালক আজিজুর রহমান (৪০) ও যাত্রী এরশাদ আলী (৪৫)। বেনাপোল থেকে ঢাকাগামী রূপসী বাংলা ট্রেনের ধাক্কায় ইজিবাইকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এর আগে গত ১০ মে অভয়নগরের ভাঙাগেট এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় কয়লাবোঝাই একটি ট্রাক প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ছিটকে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান ট্রাকচালক মনোয়ার হোসেন। পঙ্গুত্ব বরণ করেন তার সহকারী রায়হান।
এ দুটি দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, যশোর-বেনাপোল, যশোর-কোটচাঁদপুর ও যশোর-খুলনা রুটের যশোর অংশে ১৭৭টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টির অনুমোদন নেই। অনুমোদিত ৭৮টি ক্রসিংয়ের ৩৮টিতেই নেই গেটম্যান।
রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তার অন্যতম দায়িত্ব গেটম্যানের। ট্রেন আসার খবর পেয়ে সময়মতো গেটবার নামানো এবং যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল বন্ধ করাই তাদের কাজ। কিন্তু যশোরের অনেক ক্রসিংয়ে ট্রেনের আগমনী সংকেত দেওয়ার জন্য নেই আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। গেটম্যানদের একাংশকে অন্য গেটের কর্মীদের মোবাইল ফোনে দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফোনে চার্জ না থাকা, নেটওয়ার্কের সমস্যা কিংবা কল করতে ভুল হলে সংকেত পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে।
যশোর শহরের খড়কী রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান সুকান্ত সিংহের ভাষায়, সেখানে তিনজন গেটম্যান ৮ ঘণ্টা করে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। এক গেট থেকে অন্য গেটে ফোন করে ট্রেনের খবর জানানো হয়। কোনো গেটের কর্মী সময়মতো ফোন না করলে ট্রেনের সংকেত মিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফোনে চার্জ না থাকলে কিংবা নেটওয়ার্কে সমস্যা হলেও বিপত্তি ঘটে। গেটম্যানদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকায় তাদের দায়িত্ব পালনেও অসুবিধা হয়।
যশোর-কোটচাঁদপুর রেলপথের খড়কী এলাকায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে সাতটি লেভেল ক্রসিং। এর মধ্যে অনুমোদিত মাত্র একটি। খড়কী ধোপাপাড়ার সড়কটি যশোর পৌরসভার দক্ষিণ অংশের বহু মানুষের শহরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ। পাশেই খড়কী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন শতাধিক অথচ রেলক্রসিংটিতে নেই গেটম্যান।
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক আল ইমরানের দাবি, অননুমোদিত ক্রসিংটি দিয়ে শিশুদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। বিকল্প প্রধান সড়ক না থাকায় শিক্ষার্থীদের এই পথ ব্যবহার করতে হয়। এর আগে সেখানে দুর্ঘটনায় একজন আহত হয়ে অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের দাবি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় লোকজন যেখানে-সেখানে সড়ক নির্মাণ করায় অনুমোদনহীন ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। পৌরসভা, এলজিইডি ও সড়ক নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সড়ক রেললাইন অতিক্রম করলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
যশোর রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. চাঁদের ভাষ্য, অতীতে বিভিন্ন দপ্তরের অধীনে বৈধ থাকা কিছু ক্রসিং বর্তমানে জনবল সংকটে গেটম্যানহীন হয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ক্রসিং বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়মিত চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হচ্ছে। যেসব ক্রসিং জরুরি এবং বৈধ করা প্রয়োজন, সেগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়াও চলছে।
‘দূরবর্তী এলাকার ক্রসিংগুলোয় বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিক করতে পরীক্ষামূলকভাবে কর্ডলেস মোবাইল সিস্টেমও চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ ব্যবস্থা অন্য গেটগুলোয় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে’— যোগ করলেন তিনি।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, যশোর জেলায় তাদের সংশ্লিষ্ট সড়কে ৪০টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৩৪টির অনুমোদন নেই। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সদর উপজেলায় ১৪টির মধ্যে ৮টির অনুমোদন নেই। এ ছাড়া অভয়নগরে ৩, ঝিকরগাছায় ১৪ এবং শার্শায় ৯টি অবৈধ ক্রসিংয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এলজিইডি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তাদের অধীন সড়কের ক্রসিংগুলোয় গেটম্যান নিয়োগের জন্য রেল বিভাগকে জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
যশোর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমানের দাবি, রেলক্রসিংগুলো নিয়ে জরিপ করে সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে প্রকৌশলীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তথ্য ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।



