তিন বছর ধরে বালিকা বিদ্যালয়ে নেই নারী শিক্ষক

ছবি: আগামীর সময়
সকালের ক্লাস চলছে। হঠাৎ ক্লাসে এক শিক্ষার্থী অস্বস্তিতে চুপচাপ বসে আছে। কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারছে না। চারপাশে পুরুষ শিক্ষক, লজ্জা আর সংকোচে নিজের সমস্যার কথাটাই যেন কোথাও আটকে যায়। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর জন্য।
১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানে ২০২৩ সাল থেকে নেই কোনো নারী শিক্ষক। একই সঙ্গে দীর্ঘ তিন বছর ধরে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকের পদও। ১৯টি শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ শিক্ষক।
তবে শিক্ষক সংকটের মধ্যেও বিদ্যালয়ের ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১১৭ জনের মধ্যে ১০৭ জন পাস করেছে। জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪১ শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়টির পাসের হার ৯২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
তবে সাফল্যের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে শিক্ষার্থীরা বলছে ভিন্ন কথা, নারী শিক্ষক না থাকায় তারা নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেছে, ‘আমি চার বছর ধরে এই স্কুলে আছি। আগে একজন নারী শিক্ষক ছিলেন, এখন কোনো নারী শিক্ষক নেই। পিরিয়ডের সময়, বিশেষ করে ছোট ক্লাসের মেয়েরা হঠাৎ শারীরিক সমস্যায় পড়লে খুব দিশেহারা হয়ে যায়। তখন কী করবে বুঝে পায় না। প্রয়োজনীয় স্যানেটারি ন্যাপকিন অনেক সময় সঙ্গে থাকে না। লজ্জার কারণে পুরুষ শিক্ষকদের কাছেও কিছু বলতে পারে না।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানায় আরেক শিক্ষার্থী বৈশাখী পাল। তার ভাষ্য, স্যাররা আমাদের ভালোভাবে পড়ান, এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু মেয়েদের কিছু বিষয় থাকে, যা আমরা পুরুষ শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি বলতে সংকোচ বোধ করি। আমাদের গার্লস গাইড দল থাকলেও নারী প্রশিক্ষক না থাকায় কার্যক্রম বন্ধের মতো হয়ে গেছে।
একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক শাহাদাত হোসেন মুন্সি। তার অভিযোগ, ‘আমার মেয়ে এই স্কুলে পড়ে। এটি একটি বালিকা বিদ্যালয়, অথচ একজনও নারী শিক্ষক নেই। খুবই দুঃখজনক। মেয়েদের অনেক বিষয় আছে, যা তারা নারী শিক্ষকের সঙ্গে সহজে শেয়ার করতে পারে। নারী শিক্ষক থাকলে তারা অনেক বেশি স্বস্তিতে থাকত।’
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন জানান, পাঠদান ঠিকমতো চলছে। তবে শিক্ষার্থীরা অনেক ব্যক্তিগত ও শারীরিক বিষয় পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা বলতে পারে না। এ ছাড়া বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম ও বাইরের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারী শিক্ষক না থাকায় কিছুটা অসুবিধা হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী বলেছেন, ২০২৩ সাল থেকে এখানে প্রধান শিক্ষক নেই। ১৯টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১৩ শিক্ষক কর্মরত। এর মধ্যে একজনও নারী শিক্ষক নেই। বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত নারী শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সামছুন নাহার পারভীন আগামীর সময়কে বলেছেন, বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হলেও এখনো কোনো নিয়োগ আসেনি।






