হারিয়ে যাচ্ছে ঔষধিগাছ আকন্দ

ছবি: আগামীর সময়
একসময় গ্রামের মেঠোপথ, পতিত জমি, বাঁধের ঢাল কিংবা ঝোপঝাড়ে অবহেলায় জন্ম নিত আকন্দ। কারও যত্নের প্রয়োজন হতো না। অথচ এই অনাদৃত উদ্ভিদই ছিল গ্রামীণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার অন্যতম নির্ভরতা। বাত ব্যথা, হাড়ের আঘাত, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন চর্মরোগের ঘরোয়া চিকিৎসায় আকন্দের পাতা, ফুল, মূল ও দুধের মতো সাদা কষের ব্যবহার ছিল বহুল প্রচলিত। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসার বিস্তার, ভেষজ উদ্ভিদের প্রতি অনাগ্রহ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের ফলে আজ গ্রামবাংলা থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এই মূল্যবান ঔষধি উদ্ভিদ।
উদ্ভিদবিদদের মতে, আকন্দ (Calotropis) একটি মাঝারি আকারের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত সাত থেকে আট ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এর দুটি জাত বেশি দেখা যায়—সাদা ফুলের আকন্দ এবং বেগুনি ফুলের আকন্দ। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে গাছে ফুল ফোটে, মে-জুনে ফল ধরে এবং আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে ফল পরিপক্ব হয়। পাতা ও কাণ্ড ভাঙলে দুধের মতো সাদা কষ বের হয়, যা ভেষজ চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয় হাকিম মাহফুজ বললেন, একসময় গ্রামীণ মানুষ ভাঙা-মোচকা, বাত ব্যথা, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় আকন্দের পাতা নিয়মিত ব্যবহার করত। এখন নতুন প্রজন্ম এই গাছ চেনেই না। ফলে শত বছরের সনাতনি চিকিৎসা ব্যবস্থাও হারিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলার চকপাড়া গ্রামের শাহ আলমের মতে, আগে গ্রামের প্রায় প্রতিটি সড়কের পাশে আকন্দ গাছ দেখা যেত। আমাদের মায়েরা বাতের ব্যথায় আকন্দ পাতার সেঁক দিতেন। এতে দ্রুত ব্যথা কমে যেত। এখন সেই গাছ খুঁজেই পাওয়া যায় না।
বিরামপুর মডার্ন ক্লিনিকের হারবাল চিকিৎসক ডা. সামিদুল ইসলাম বললেন, আকন্দসহ অনেক ভেষজ উদ্ভিদ একসময় বন-জঙ্গল ও পতিত জমিতে সহজেই পাওয়া যেত। বর্তমানে আগাছা মনে করে এসব গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে মূল্যবান ভেষজসম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলার ভেলারপাড় গ্রামের আব্দুল হালিম স্মৃতিচারণ করলেন, আগে সরিষার তেল, কেরোসিন ও মহাশঙ্কর তেল গরম করে মালিশ করার পর আগুনে হালকা গরম করা আকন্দ পাতা ব্যথার স্থানে সেঁক দেওয়া হতো। এতে খুব দ্রুত ব্যথা উপশম হতো। এই চিকিৎসা ছিল কম খরচের, নিরাপদ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত। এখন প্রয়োজন হলেও আকন্দগাছ পাওয়া যায় না।
দিনাজপুর সিভিল সার্জন ডা. গোলাম রসুল রাখী জানালেন, আকন্দের পাতা, ফুল, ফল, মূল ও কষে নানা ধরনের ভেষজ গুণ রয়েছে। লোকজ চিকিৎসায় হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, দাঁতের ব্যথা, চর্মরোগ, ক্ষত, হজমের সমস্যা, বহুমূত্রসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় এর ব্যবহার প্রচলিত ছিল। তবে এসব ব্যবহার অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত, কারণ গাছটির কষ সরাসরি ব্যবহার করলে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়াও হতে পারে
দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুরুন্নাহার জানান, আকন্দের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যালোট্রপিস গিগান্টিয়া। এটি Apocynaceae (পূর্বের শ্রেণিবিন্যাসে Asclepiadaceae) গোত্রভুক্ত উদ্ভিদ। এর পাতা ও কাণ্ডে থাকা দুধের মতো কষ এবং পাতার বিভিন্ন উপাদান ভেষজ গুণসম্পন্ন। তবে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, অপরিকল্পিত আগাছা পরিষ্কার এবং সংরক্ষণের অভাবে এই উদ্ভিদ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।
দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ এইচ এম বোরহান-উল-ইসলাম সিদ্দিকী বললেন, আকন্দের কষে বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক উপাদান ও গ্লাইকোসাইড রয়েছে, যা নিয়ে আধুনিক গবেষণাও চলছে। তবে এই উদ্ভিদে বিষাক্ত উপাদানও বিদ্যমান। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এর কষ বা অন্য অংশ ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই উদ্ভিদ শুধু লোকজ চিকিৎসার ঐতিহ্যই নয়, ভবিষ্যৎ ওষুধ গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি আকন্দসহ দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
গ্রামবাংলার মানুষ বিশ্বাস করেন, আধুনিক চিকিৎসার যুগেও প্রকৃতির এই প্রাচীন ভেষজসম্পদ সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষা পাবে এক অমূল্য চিকিৎসা ঐতিহ্য।







