এই মানুষটি সেই মানুষ নয়

সংগৃহীত ছবি
একজনের অপরাধের দায় গিয়ে পড়েছিল আরেকজনের ঘাড়ে। বিশাল ইয়াবা চালানসহ ধরা পড়া এক ব্যক্তি পুলিশের কাছে নাম-পরিচয় দেন ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে। এই নামেই চলে বিচারকাজ। কিছু দিন পর জামিন পেয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ছয় বছর পর মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয় তিনিসহ দলের বাকি চারজনের।
রায়ের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রকৃত পরিচয়ের সোনা মিয়াকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে পাঠায় কক্সবাজার কারাগারে। পরে কারাগারে গিয়ে বিষয়টি জানান সোনা মিয়া। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে সাজা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া এক ব্যক্তি নন।
এ মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক। রায়ের পর পলাতক আসামি সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে গত ২৩ জুন রামু থেকে সোনা মিয়া নামে এক দিনমজুরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১৫।
কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যেই তিনি জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন। জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন। কখনো ওই মামলায় গ্রেপ্তারও হননি। বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নাম সোনা মিয়া নয়। তার আসল নাম মো. রমজান। তিনি অন্যের জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
ঘটনার শুরু ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওইদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি করা হয় সোনা মিয়াকে। বাবার নাম নজির আহমদ। ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয় কক্সবাজার পৌরসভার কুতুবদিয়াপাড়া ও রামুর গর্জনিয়া।
তবে তদন্তের সময়ই আসামির পরিচয় নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ অনুসন্ধান করেও সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা নিশ্চিত করতে পারেনি।
তারপরও সেই পরিচয়েই মামলা এগিয়ে যায়। ২০২২ সালের ১৩ জুন কথিত সোনা মিয়া জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হয়।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, রমজান ও দিনমজুর সোনা মিয়া একসময় একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছিলেন। পরে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করেন। কোনো একসময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের তথ্য বা কাগজপত্র রমজানের হাতে চলে যায়। সেই পরিচয় ব্যবহার করেই তিনি ইয়াবা মামলায় সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুরনো ও নতুন কারাগারের নথি, ছবি ও শারীরিক পরিচিতি যাচাই করেও দুই ব্যক্তির মধ্যে অমিল পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের নথিতে থাকা ব্যক্তির উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি ও ওজন ৫০ কেজি। তার দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষত চিহ্নের উল্লেখ ছিল। আর ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি। তার শরীরে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে তিল রয়েছে।
দিনমজুর সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেছেন, তার স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়িত ছিলেন না। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজানের সঙ্গে তার স্বামীর পরিচয় ছিল। তার দাবি, রমজানই সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই আসামির পরিচয় নিশ্চিত করতে না পারার কথা জানিয়েছিলেন। এরপরও কীভাবে সেই পরিচয়ে বিচার চলল এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলছিলেন, আসামির প্রকৃত পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুতর গাফিলতি ছিল। অন্যের পরিচয় ব্যবহার করা হলে প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি সোনা মিয়া নন, তার নাম রমজান। তদন্তে উঠে এসেছে এ তথ্য।
অবশেষে গত বুধবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত দেন। তবে তাকে মানতে হবে চারটি শর্ত। জাতীয় পরিচয়পত্র বা পরিচয়পত্র জমা দেওয়া, প্রতি সপ্তাহে থানায় হাজিরা, দেশত্যাগ না করা এবং প্রতি তিন মাস পর আদালতে হাজির হওয়া।
একই সঙ্গে প্রকৃত আসামি রমজানকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, একজনের পরিচয় চুরি করে তার ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার এ ঘটনায় আপাতত মুক্তির পথ খুলেছে সোনা মিয়ার। কিন্তু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতা কীভাবে একজন নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির কাতারে নিয়ে গেল, আর প্রকৃত অভিযুক্ত কীভাবে এত দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সংশ্লিষ্টদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।






