কপাল পুড়ল ৫ হাজার কৃষকের
- মানিকগঞ্জে অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি ৩ কোটি টাকা
- সবজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে দাম
- বিপাকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ

ছবি: আগামীর সময়
গত কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টিতে মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলার নিচু এলাকার সবজিসহ নানা ধরনের ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় জমিতে পানি জমে থাকায় নষ্ট হয়েছে শত শত বিঘা জমির ফসল। বৃষ্টির কারণে জেলায় ৪ হাজার ৮৮৫ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফসলের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার।
ফসলের মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারগুলোয়। বেড়েছে দাম। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। অন্যদিকে টানা বৃষ্টির কারণে জমিতে ফসল নষ্ট হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচা মরিচ, পেঁপে, আমন ধান, পাট ও বিভিন্ন মৌসুমি সবজির আবাদ। লাউ, বেগুন, ধুন্দুল, লালশাক, করলা, চালকুমড়া, পটোল, মুলাশাক, ঢেঁড়স, শসাক্ষেতেরও ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলায় ১০ হাজার ২২৮ হেক্টর জমিতে ফসল ও বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৯৩ হেক্টর জমিতে বর্তমানে সবজি ও ফসল রয়েছে। তবে অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২২ হেক্টর জমির ফসল। এতে ৪ হাজার ৮৮৫ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রাথমিকভাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে ৩ কোটি ১৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
ফজেলার সাটুরিয়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে সবজিক্ষেতে পানি জমে গেছে। মরিচগাছের গোড়া, ওপরের পাতা পচে যাচ্ছে। পাতাগুলো পচে ঝরে পড়ছে। ধুন্দুল ও পটোলক্ষেতের মাচার ওপর নুয়ে পড়েছে গাছগুলো। কয়েক কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেতে কাজও করতে দেখা গেছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে সবজি, ৯০০ হেক্টরে পেঁপে, ২৩১ হেক্টরে রোপা আমনের বীজতলা এবং ৪৩০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবজি ১ হাজার ৬২৬ হেক্টর, পেঁপে ৯০০ হেক্টর, রোপা আমনের বীজতলা ২৩১ হেক্টর, পাট ৪ হাজার ৫৩৬ হেক্টর, মরিচ ৪১৯ হেক্টর জমিতে বর্তমানে ফসল রয়েছে। তবে সম্প্রতি অতিবৃষ্টির কারণে এর মধ্যে ১৪৪ হেক্টর জমির বিভিন্ন সবজি, ৫৫ হেক্টর পেঁপে ও ১৬ হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা পানিতে নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ হেক্টর বেগুন, ৩৬ হেক্টর লাউ, ২৫ হেক্টর ধুন্দুল, ৯ হেক্টর লালশাক, ৭ হেক্টর করলা, ৬ হেক্টর মুলাশাক, ৫ হেক্টর পুঁইশাক, ৫ হেক্টর পটোল, ৩ হেক্টর চালকুমড়া, ২ হেক্টর ঢেঁড়স এবং ১ হেক্টর জমির শসাক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।
সদর উপজেলার আটিগ্রামের কৃষক আওলাদ মিয়া বলেছেন, চলতি মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে ধুন্দুলের আবাদ করতে জমি প্রস্তুত, বীজ রোপণ, কীটনাশক ও সার, মাচা তৈরিতে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে ৫-৭ হাজার টাকার মতো ধুন্দুল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেছেন। এরপর থেকে বৃষ্টির কারণে তার সবজিক্ষেতে পানি জমে ধুন্দুলগাছগুলো মরে গেছে। লাভ তো দূরে থাক খরচের টাকাই উঠল না।
সাটুরিয়ার জান্না গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ শহিদুল বলেছেন, আমরা কৃষক মানুষ, সারা বছর নানা ধরনের সবজির চাষাবাদ করেই সংসারের খরচ চালাই। এ বছরও এক বিঘা জমিতে বেগুন, প্রায় দেড় বিঘা জমিতে লালশাক ও মুলাশাক আবাদ করেছিলাম। তবে টানা বৃষ্টিতে সবজিক্ষেতে পানি জমে সব গাছ
মরে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শহিদুল দাবি করেন, ‘ধারদেনা করে সবজির আবাদ করেছিলাম, বৃষ্টিতে সবই নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সরকার থেকে আমাগো ক্ষতিপূরণ দিলে চলার মতো উপায় হইতো।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাজাহান সিরাজ মন্তব্য করেন, ‘জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এলাকা ঘুরে ঘুরে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ পান, সেজন্য তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।’





