১২ কোটির জাদুঘরে দর্শনার্থী খরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফরিদপুর শহর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার উত্তরে অম্বিকাপুরের গোবিন্দপুর গ্রাম। কুমার নদের তীরে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের জন্মভিটা। কবির স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন; কিন্তু বাড়ির পাশেই প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পল্লীকবি জসীম উদ্দীন জাদুঘর ও লোক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সম্পর্কে তাদের অনেকেরই জানা নেই। বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয় সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয়। প্রতি শুক্র ও শনিবার জসীম উদ্দীনের জন্মভিটায় দর্শনার্থীর ভিড় থাকে। দর্শনার্থী আসছেন; কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ জাদুঘর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছেন না। এর পেছনে মূলত প্রচারের ঘাটতি ও টিকিট ব্যবস্থার জটিলতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা পল্লীকবি জসীম উদ্দীন জাদুঘর ও লোকসাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি। জাদুঘরের প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০০৬ সালে। নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ উদ্বোধন করা হলেও ৯ ডিসেম্বর খুলে দেওয়া হয় দর্শনার্থীদের জন্য। চার একর জমির ওপর নির্মিত জাদুঘরে গ্যালারি, অফিস, লাইব্রেরি ও ডরমেটরি ভবন রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ।
স্থানীয়রা বলছেন, জাদুঘর ও লোকসাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি স্থাপত্যের দিক থেকে দৃষ্টিনন্দন। ভেতরটিও পরিপাটি। কবির জীবন ও সাহিত্যকর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা এ জাদুঘরটি সহজেই দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে পারে; কিন্তু সেই সম্ভাবনার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার বেশ ফারাক। পর্যাপ্ত তদারকি ও প্রচারের অভাবে স্থাপনাটি ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার জৌলুস।
শুধু দর্শনার্থীর সংকট নয়, স্থাপনাটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও রয়েছে সমস্যা। দর্শনার্থীদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পানীয় জলের সুব্যবস্থাও নেই। মালি না থাকায় বাগানের বিভিন্ন অংশে জমেছে আগাছা। ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে নোনা ধরেছে এবং কোথাও কোথাও রঙের প্রলেপ খসে পড়ছে।
দর্শনার্থীদের অভিযোগ, জসীম উদ্দীনের জন্মভিটা দেখতে এসে পাশেই যে একটি জাদুঘর রয়েছে, সে সম্পর্কে তাদের জানানো হয় না। রাকিব হাসান নামে এক দর্শনার্থীর ভাষায়, তারা প্রথমে কবির বাড়ি দেখতে যান। বাড়ির পাশেই জাদুঘর রয়েছে— এ তথ্য তাদের জানা ছিল না। বাড়ির ভেতরে প্রবেশের জন্য টিকিট কাটলেও জাদুঘর সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কেউ তাদের জানাননি।
রাকিবের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সমস্যাটির আরেকটি দিকও সামনে আসে। সেটি হলো পাশাপাশি থাকা দুটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা টিকিট ব্যবস্থা। দর্শনার্থীদের অনেকেই প্রথমে কবির মূল ভিটাবাড়িতে প্রবেশের জন্য ২০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটেন। পরে পাশেই আরেকটি জাদুঘরের জন্য আবার টিকিট কাটার প্রয়োজন হলে অনেকে আর আগ্রহ দেখান না।
দর্শনা থেকে আসা রূপকও মনে করেন, জাদুঘরটির প্রচার বাড়ানো জরুরি। তার ভাষায়, এত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি জাদুঘর সম্পর্কে মানুষের জানার সুযোগ না থাকাটা দুঃখজনক।
শুধু বাইরের জেলা থেকে আসা দর্শনার্থীরাই নন, স্থানীয় মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে। ফরিদপুরে বাড়ি হলেও ঢাকায় থাকেন সেতু আক্তার। তিনি বললেন, ‘ফরিদপুরের মানুষ হিসেবে পল্লীকবি জসীম উদ্দীন আমাদের গর্ব। কর্মের কারণে ঢাকায় থাকলেও সুযোগ পেলেই কবির বাড়ি আসা হয়। তবে বাড়ি ও জাদুঘরের ব্যবস্থাপনার পার্থক্য আমাকে হতাশ করে।’ তার মতে, কবির পরিবার নিজ উদ্যোগে বাড়ির ভেতর দেখার ব্যবস্থা করেছে, আর সরকার জাদুঘর নির্মাণ করেছে; কিন্তু প্রচারের অভাবে সরকারি জাদুঘরটি যেন আড়ালেই থেকে গেছে।
দর্শনার্থীদের এসব অভিযোগের সঙ্গে অনেকটাই একমত জাদুঘর কর্তৃপক্ষও। জসীম উদ্দীন জাদুঘরের ইনচার্জ মুকেশ চন্দ্র রায়ের ভাষ্য, ‘পাশাপাশি দুটি স্থাপনা থাকায় দর্শনার্থীরা বিভ্রান্ত হন। কবির বাড়িতে প্রবেশের সময় টিকিট কেটে ফেলার পর অনেকে আর আলাদা করে জাদুঘরের টিকিট কাটতে চান না। ফলে জাদুঘরে দর্শনার্থী কমে যায়।’ পাশাপাশি প্রচারের ঘাটতির কথাও স্বীকার করেন তিনি।
তবে কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সমস্যাটি সমাধানে নেওয়া হচ্ছে উদ্যোগ। মুকেশ চন্দ্র রায় জানালেন, প্রচারের জন্য জাতীয় জাদুঘর থেকে কাজ চলছে। প্রচার বাড়ানো গেলে দর্শনার্থীর কাছে জাদুঘরটির গুরুত্ব তুলে ধরা সম্ভব।







