সাতক্ষীরা
পতিত লবণাক্ত জমিতে ভুট্টা-ধান চাষে সফল কৃষক

লবণাক্ত জমিতে পরীক্ষামূলক ভুট্টা চাষ। ছবি: আগামীর সময়
সাতক্ষীরায় দীর্ঘদিন পতিত থাকা লবণাক্ত জমিতে পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা পেয়েছেন কৃষক শিলা রাণী ও রুহুল আমিন। প্রায় ১০ মাত্রার লবণাক্ততাসম্পন্ন ৩ একর জমিতে ভুট্টা, বিনাধান-১০ ও ব্রিধান-৯৯ জাতের ধান চাষ করেন।
শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের হাওয়ালভাঙি গ্রামে সেই জমিতে প্রথমবারের মতো ডিবলিং পদ্ধতিতে (নির্দিষ্ট গভীরতা ও দূরত্বে ছোট গর্তে বীজ/চারা রোপণ) ভুট্টা চাষ করে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছেন তারা।
উপকূলীয় এই অঞ্চলে আমন মৌসুমের পর মিঠা পানির অভাবে হাজার হাজার বিঘা জমি বছরের বেশিরভাগ সময় অনাবাদি পড়ে থাকত। লবণাক্ততার কারণে বোরো বা রবি মৌসুমে চাষাবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অর্থায়নে এবং বিনা উপকেন্দ্র, সাতক্ষীরার বাস্তবায়নে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় লবণসহনশীল ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।
এই উদ্যোগের অন্যতম বিশেষত্ব হলো প্রথমবারের মতো ডিবলিং পদ্ধতিতে ভুট্টা চাষ। নির্দিষ্ট গভীরতা ও দূরত্ব বজায় রেখে ছোট গর্তে বীজ বা চারা রোপণের এই পদ্ধতি ধান কাটার পর জমি নতুন করে চাষ না দিয়েই প্রয়োগ করা যায়, ফলে সাশ্রয় হয় সময় ও খরচ দুটোই।
এই সাফল্যকে সামনে রেখে গত শনিবার বিকেলে হাওয়ালভাঙি গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় এক মাঠ দিবস। এতে অংশ নেন স্থানীয় কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা, গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএআরসির সিএসও ও পার্টনার প্রোগ্রামের ফোকাল পয়েন্ট ড. মো. হারুনুর রশীদ। তিনি বলেছেন, উপকূলীয় লবণাক্ত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে পারলে আরও শক্তিশালী হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে কৃষিতে।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম মাঠ পর্যায়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, এই মডেল সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
ওয়ার্কিং সায়েন্টিস্ট ড. মো. জামাল উদ্দীন লবণসহনশীল জাত ও সঠিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, উপযুক্ত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীল করা সম্ভব অনাবাদি জমিকেও। যা কার্যকর ভূমিকা রাখবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিসার ওয়ালিউল ইসলাম জানান, এ উদ্যোগ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে। নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।
সভাপতির বক্তব্যে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুজ্জামান বলেছেন, ডিবলিং পদ্ধতিতে ধান কাটার পর জমি চাষ না করেই চারা রোপণ সম্ভব। ফলে অতিরিক্ত খরচ কমে যায় কৃষকের। তিনি জানান, ভুট্টা, বিনা সরিষা ও বিনাধান-১০-এর মতো লবণসহনশীল ফসল উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
কৃষক শিলা রাণী জানান, আগে কোনো ফসল হতো না এই জমিতে। এখন ভুট্টা ও ধানের ভালো ফলন পেয়ে আশাবাদী।
অন্যদিকে রুহুল আমিন বলেন, লবণাক্ততার কারণে একসময় জমি পতিত রাখতে হলেও এখন বিজ্ঞানীদের সহায়তায় চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। ভবিষ্যতে এ পদ্ধতি প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে অন্য জমিতেও।
এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং লবণসহনশীল ফসল চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেন মাঠ দিবসে অংশ নেওয়া অন্য কৃষকরাও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণসহনশীল ফসলের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিতে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। এর ফলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, এ কার্যক্রমটি পার্টনার প্রোগ্রাম, বিএআরসির অর্থায়নে এবং বিনা উপকেন্দ্র, সাতক্ষীরার বাস্তবায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সহযোগিতা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা।



