সরকারি নথিতে ‘ভারতীয় ইলিশ’, বিক্রি হচ্ছে মিয়ানমারের নামে

ছবি: আগামীর সময়
বেনাপোল স্থলবন্দরের সরকারি নথিতে আমদানি করা ইলিশকে ভারতীয় হিসেবে উল্লেখ করা হলেও যশোরের বাজারে একই মাছ ‘মিয়ানমারের ইলিশ’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। মাছের উৎস নিয়ে সরকারি নথি ও বাজারজাতকরণের এই বৈপরীত্যে ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে বাজার তদারকি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও।
এদিকে উৎস গোপন করে মাছ বিক্রি ঠেকাতে বাজারে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যশোরের বড় বাজারের মাছের বাজারে অভিযান চালিয়ে নির্ধারিত মূল্য ও আমদানীকৃত মাছের এলসি-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে না পারায় কর্ণফুলী ফিস নামের একটি আড়তকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বড় বাজারের বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি মাছের দোকান মনিটরিং করা হয়। তিনি জানিয়েছেন, বাজারে ভারতীয় ইলিশের ক্রয় ও বিক্রয়মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে ভারত থেকে মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসা এই চালানের ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশই এসেছে আগস্টে।
জুলাই মাসে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ আমদানি হয়। দৈনিক গড় আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৫০ কেজি। আগস্টে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ এসেছে, যার দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১০ হাজার ৪৩০ কেজি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ইলিশ আমদানি বেড়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৯৮ গুণ।
দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের মোট ঘোষিত মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি ইলিশের গড় ঘোষিত মূল্য প্রায় ১৯৬ টাকা।
বেনাপোল দিয়ে বৈধভাবে আমদানি করা এই মাছের উৎস নিয়েই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। যশোর বড় বাজারের ব্যবসায়ী ও আড়তদার নীলমল কুমার দাবি করেন, বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়া বড় আকারের ইলিশগুলো মূলত মিয়ানমারের মাছ। তার ভাষ্য, এসব মাছ ভারত হয়ে বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
তবে বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম জানিয়েছেন, বেনাপোল দিয়ে আমদানি করা ইলিশ ভারতীয়। এসব ইলিশ মূলত ভারতের গুজরাট থেকে আসছে। তার ভাষ্য, মিয়ানমারের ইলিশ সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়।
যশোরের বাজারে দেশি ও আমদানি করা ইলিশের দামে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৩ কেজি ওজনের দেশি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়। অন্যদিকে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ কেজি ওজনের আমদানি করা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
আমদানি পর্যায়ে ঘোষিত প্রতি কেজির মূল্য প্রায় ১৯৬ টাকা হলেও বাজারে বিক্রির সময় দামের ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে দেশি ও আমদানি করা ইলিশের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ওহেদুজ্জামান জানিয়েছেন, দেশি ইলিশ মনে করে মাছ কেনার পর রান্না করে স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য পেয়েছেন। তার ভাষ্য, সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে মাছের উৎস বা মানের পার্থক্য শনাক্ত করা কঠিন।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন জানিয়েছেন, আমদানি করা মাছকে দেশি বলে বিক্রি করার ক্ষেত্রে মৎস্য আইনে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান জানিয়েছেন, মাছের উৎস গোপন করে বিক্রি ঠেকাতে বাজারে তদারকি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, ভারতীয় ইলিশের ক্রয়-বিক্রয়মূল্য এবং আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।




