সীমান্ত শহর টেকনাফে ব্রাজিল উন্মাদনা

ছবি: আগামীর সময়
সমুদ্রের গর্জন, পাহাড়ঘেরা আঁকাবাঁকা পথ আর বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভের শহর টেকনাফ। সেই সীমান্ত শহরেই এখন বইছে অন্যরকম এক উন্মাদনার হাওয়া। বিশ্বকাপের বাঁশি বাজতে এখনও এক বছর বাকি, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে শুরু হয়ে গেছে উৎসব। হলুদ-সবুজ পতাকায় ছেয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, অলিগলি থেকে মেরিন ড্রাইভের বিস্তীর্ণ পথ। যেন ধীরে ধীরে ছোট্ট এক ‘ব্রাজিলে’ রূপ নিচ্ছে কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে।
আজ সোমবার বিকেলে সেই উন্মাদনা নতুন মাত্রা পায়। শত শত মোটরসাইকেল, হাজারো সমর্থক আর ব্রাজিলের পতাকার ঢেউয়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো টেকনাফ। উপজেলা গেইট থেকে শুরু হওয়া বিশাল বাইক শোভাযাত্রা টেকনাফ স্থলবন্দর হয়ে পৌঁছে যায় মেরিন ড্রাইভের জিরো পয়েন্টে। পরে সেখান থেকে পুরো মেরিন ড্রাইভ প্রদক্ষিণ করে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে শেষ হয় বর্ণাঢ্য এই আয়োজন।
শোভাযাত্রার শুরু থেকেই ছিল উৎসবের আবহ। কারও মাথায় ব্রাজিলের ব্যান্ডানা, কারও গায়ে নেইমারের জার্সি। কেউ আবার মোটরসাইকেলের সামনে উড়িয়ে চলেছেন বিশাল আকৃতির ব্রাজিলের পতাকা। ভুভুজেলার শব্দ, স্লোগান আর মোটরসাইকেলের বহরের গর্জনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয়রাও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান সমর্থকদের।
ব্রাজিল সমর্থক মুর্শেদ বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ এলেই আমাদের ভেতরে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলকে সমর্থন করি। এই দলের ফুটবলে সৌন্দর্য আছে, শিল্প আছে। তাই ব্রাজিল আমাদের কাছে শুধু একটি দল নয়, আবেগের নাম।’
সমর্থক নোমান বলেছেন, ‘নেইমার মাঠে নামলেই আমরা অন্যরকম আত্মবিশ্বাস পাই। এবারও ব্রাজিলই বিশ্বকাপ জিতবে বলে আশা করছি।’এই আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা বাহা উদ্দিন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে কয়েকদিন ধরেই সমর্থকদের একত্রিত করা হচ্ছিল। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আনন্দ ভাগাভাগি করতেই আয়োজন করা হয় এই বাইক শোভাযাত্রার।
‘টেকনাফে ব্রাজিল সমর্থক অনেক। সবাই মিলে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতেই এই আয়োজন। ফুটবল আমাদের কাছে শুধু খেলা নয়, এটি আনন্দ ও ভালোবাসার জায়গা।’—যোগ করেন তিনি।
শুধু শোভাযাত্রাতেই সীমাবদ্ধ নেই এই উন্মাদনা। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, বাসাবাড়ির ছাদে উড়ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও জার্মানির পতাকা। কোথাও বাড়ির দেয়াল রাঙানো হচ্ছে প্রিয় দলের রঙে, আবার কোথাও কয়েকতলা সমান বিশাল পতাকা টানানোর প্রস্তুতি চলছে। চায়ের দোকান থেকে বাজার—সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বিশ্বকাপ।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ এলেই টেকনাফে ফুটবল নিয়ে অন্যরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কে বড় পতাকা টানাবে, কার বাড়ির সাজসজ্জা বেশি আকর্ষণীয় হবে এসব নিয়েও চলে নীরব লড়াই।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে উত্তেজনার অন্যতম কারণ, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরে। যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। আগামী ১১ জুন মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে পর্দা উঠবে বিশ্বকাপের। আর ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের মিটলাইফ স্টেডিয়াম-এ অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল ন্যাশনাল ফুটবল টিম। তাই টেকনাফের সমর্থকদের স্বপ্নও আকাশছোঁয়া।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দল ব্রাজিল এখন পর্যন্ত পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। আর সেই সেলেসাও-প্রেমের রঙেই এখন রাঙা টেকনাফ। সীমান্ত শহরের বাতাসে তাই এখন একটাই সুর—‘ব্রাজিল, ব্রাজিল!’।







