ভবদহের বিস্তীর্ণ বিলে এবারও নেই বোরোর হাসি, ভাসছে কচুরিপানা

ছবিঃ আগামীর সময়
যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর— এই তিন উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ভবদহ অঞ্চল এখন এক বিশাল জলরাশি। চৈত্র-বৈশাখে ধানের নেই সেই সবুজ গালিচা। বিলের পর বিলে বোরো ধানের বদলে এখন ভাসছে আগাছা, কচুরিপানা আর শাপলা। বুক সমান পানির নিচে চাপা পড়েছে হাজার হাজার কৃষকের স্বপ্ন।
ভবদহ অঞ্চলে অন্তত ৫২টি ছোট-বড় বিল আছে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীর জোয়ারভাটার সঙ্গে এসব বিলের পানি ওঠা-নামা করে। কিন্তু পলি পড়ায় নদীগুলো নাব্য হারিয়েছে। ফলে এসব নদী দিয়ে এখন ঠিকমতো পানি নিষ্কাশন হয় না। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হয়। বিল উপচে পানি ঢোকে বিলসংলগ্ন গ্রামগুলোতে।
মণিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা তিনটির ভবদহ অঞ্চলে কৃষক প্রায় ৫০ হাজার। জলাবদ্ধতার কারণে এবার তিন উপজেলার সাত হাজার ২৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়নি। এর মধ্যে অভয়নগর উপজেলায় এক হাজার ২৯০ হেক্টর, কেশবপুর উপজেলায় দুই হাজার ১৩০ হেক্টর এবং মণিরামপুর উপজেলায় তিন হাজার ৮২৩ হেক্টর জমি রয়েছে।
কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুম। বোরোর বীজতলা তৈরির সময় ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত। বোরো ধানের চারা রোপণের সময় জানুয়ারি মাস। নাবিতে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানের চারা রোপণ করা যায়। গত বছর এই অঞ্চলে ১৬ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছিল।
গত সপ্তাহে ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ১০টি বিল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিলগুলো ভরে আছে পানিতে। বিলবোকড়, বিলকেদারিয়া, বিলকপালিয়া, বিলডুমুর, বিলঝিকরা, বিলগান্ধীমারি, বিলগজালমারি ও বিলপায়রায় শুধু পানি আর পানি। কোনো কোনো বিলের ওপরের অংশ চারদিকে বাঁধ দিয়ে সেচযন্ত্র দিয়ে পানি নিষ্কাশন করে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ বিলে কোনো ধানক্ষেত নেই। বিলের পানিতে ভাসছে কিছু আগাছা, কচুরিপানা আর শাপলা।
মণিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক অসীম ধর। এবার সেচযন্ত্র দিয়ে পানি নিষ্কাশন করে তিনি আট বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। ‘বিলের ওপরের অংশে পানি কম ছিল। সেচযন্ত্র দিয়ে নিষ্কাশন করে আট বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। নিচের জমিতে অনেক জল। নিষ্কাশনের অবস্থা নেই। তাই ওই জমিতে ধান লাগানো সম্ভব হয়নি,’ বলছিলেন তিনি।
অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুনের ভাষ্য, ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধ বিলের পানি নিষ্কাশন করে বোরো চাষ করেছেন কৃষকরা। জলাবদ্ধ এলাকায় গত বছরের চেয়ে এবার ১৪০ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে।
একই বিষয় পুনরাবৃত্তি করেছেন মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার। ‘ভবদহ এলাকার ছোট বিলগুলোর পানি নিষ্কাশন করে বোরো চাষে উদ্যোগী হয়েছেন কৃষকরা। শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধ এলাকায় গত বছরের চেয়ে এবার বেশি জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে। আরও কিছু জমিতে বোরো চাষ হতো। কিন্তু সেচের সময় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে তলিয়ে যাওয়ায় ২৫৫ হেক্টর জমিতে শেষ পর্যন্ত বোরো ধান চাষ সম্ভব হয়নি।’
তবে কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হামিদের। ‘কৃষি অফিস ভবদহ অঞ্চলের কৃষিজমি এবং জলাবদ্ধ কৃষিজমির যে তথ্য দিয়েছে তা ঠিক নয়। এ তথ্য অগ্রহণযোগ্য এবং বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে ভবদহ অঞ্চলে এর চেয়ে অনেক বেশি জমিতে এবার বোরো চাষ হচ্ছে না।’















