দুই এমপির চিঠিতে আটকা ৪০০ কাজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঝালকাঠি জেলা পরিষদের প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকার চার শতাধিক উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। দুই সংসদ সদস্য (এমপি) আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেওয়ার পর স্থগিত রয়েছে এসব প্রকল্পের অনুমোদন। ফলে জেলার চার উপজেলার জন্য নেওয়া উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে গেছে। প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, এ স্থবিরতার পেছনে শুধু প্রশাসনিক জটিলতাই নয়, রয়েছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও। জেলা পরিষদ প্রশাসক ও দুই নির্বাচিত এমপির মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ এখন উন্নয়ন কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
জেলা পরিষদ প্রশাসক বলছেন, পৌর এলাকার মধ্যে জেলা পরিষদের উন্নয়নকাজের এখতিয়ার নেই। তা ছাড়া এমপিদের দেওয়া সুপারিশ অনুযায়ী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে। তারপরও তারা কেন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিলেন, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।
সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল এবং ঝালকাঠি-২ আসনে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত ১৫ মার্চ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. শাহাদাৎ হোসেন। স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জীবা আমিনা খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শাহাদাতের সঙ্গে নির্বাচনের পর থেকেই দুই এমপির রাজনৈতিক দূরত্ব ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জেলা পরিষদের তথ্য বলছে, প্রশাসক চার উপজেলার জন্য ৭ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ের চার শতাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য তা পাঠান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে।
অভিযোগ ওঠে, এসব প্রকল্প নির্ধারণে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সমন্বয় করা হয়নি। দুই এমপির দাবি, বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের উন্নয়ন প্রস্তাবের অধিকাংশই।
গত ২৮ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে যৌথভাবে একটি ডিও (ডেমি-অফিসিয়াল) চিঠি পাঠান রফিকুল ইসলাম জামাল ও ইলেন ভুট্টো। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া ও পরিষদ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শের বিধান থাকলেও ঝালকাঠিতে তা মানা হয়নি। প্রশাসক একক সিদ্ধান্তে প্রকল্প নিচ্ছেন— অভিযোগ করে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নেওয়া সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধও জানালেন তারা।
ওই চিঠি পাওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও আমলে নেয় বিষয়টি। মন্ত্রণালয় থেকে জেলা পরিষদ প্রশাসকের কাছে পাঠানো চিঠিতে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নিতেও বলা হয়েছে। এর মধ্যে সেই চিঠি প্রশাসকের হাতে পৌঁছেছে। এরপর থেকেই প্রকল্পগুলোর অনুমোদন কার্যত স্থগিত।
অবশ্য সংসদ সদস্যরা বলছেন, তাদের অবস্থান আইনসম্মত। রফিকুল ইসলাম জামালের ভাষ্য, ‘জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করার বিধান রয়েছে। পদাধিকারবলে এমপিরা জেলা পরিষদের উপদেষ্টা। সে বিধান উপেক্ষা করায় বিষয়টি জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয়কে।’
একই কথা বলেছেন ইলেন ভুট্টো। তার দাবি, নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলার জন্য একাধিক উন্নয়ন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল জেলা পরিষদে। কিন্তু সেগুলোর একটিও রাখা হয়নি চূড়ান্ত তালিকায়; বরং প্রশাসক নিজের সিদ্ধান্তে তৈরি করেছেন প্রকল্প তালিকা।
তবে জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. শাহাদাৎ হোসেনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি দাবি করেন, সংসদ সদস্যদের প্রকল্প প্রস্তাব সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে— এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
‘ঝালকাঠি-২ আসনের এমপি ইলেন ভুট্টো নলছিটি পৌরসভাকেন্দ্রিক দুটি প্রকল্প পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু জেলা পরিষদের আওতায় পৌর এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। সে কারণে ওই দুটি প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদের আরও বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উন্নয়ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে’— বললেন অ্যাডভোকেট শাহাদাৎ হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রস্তুত করা হয়েছে চার শতাধিক প্রকল্পের তালিকা। এখন এসব প্রকল্প অনুমোদন না হলে পুরো জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে বিরোধের পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দুই এমপির কয়েকজন অনুসারীর অভিযোগ, ভবিষ্যতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে প্রশাসক তার ঘনিষ্ঠ ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের এলাকাভিত্তিক প্রকল্পে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সে কারণে উপেক্ষা করা হয়েছে দুই এমপির অনুসারীদের দেওয়া অধিকাংশ প্রস্তাব। যদিও প্রশাসক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।




