হামাগুড়ি দিয়েই স্বপ্নের পথে মনা

মনা বেগম
পা দুটি অচল। বাঁ হাতেও নেই শক্তি। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, হাঁটতেও পারেন না। ডান হাত ও ডান পায়ের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়েই প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন মনা বেগম (২০)। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সেই পথ পেরিয়ে গাড়িতে ওঠেন, তারপর যান কলেজে। শরীরের সীমাবদ্ধতা আর সংসারের অভাব— কোনোটিই থামাতে পারেনি তার পড়াশোনা। গত বছর এইচএসসি পাস করেছেন মনা। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যাওয়ার প্রত্যয় তার।
তবে তার এ পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর বাগানে দিনমজুর পরিবারে বেড়ে উঠেছেন মনা। বাবা হারিছ মিয়া ও মা আমিনা বেগমের সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। সেই অভাবের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকেও সঙ্গী করে এগোতে হয়েছে তাকে। কিন্তু শরীরের এ সীমাবদ্ধতা তার পড়াশোনার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং যত বাধা এসেছে, শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ যেন ততই দৃঢ় হয়েছে। সেই আগ্রহের পরীক্ষা হয়েছে প্রতিদিন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাড়ি থেকে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হতো তাকে। সেখান থেকে গাড়িতে উঠে যেতেন কলেজে। ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও একই পথ পাড়ি দিতে হতো। এই যাতায়াতের কষ্ট কখনো কখনো এতটাই বেড়ে যেত যে, শরীর দুর্বল হয়ে শ্বাস নিতেও কষ্ট হতো— বললেন মনা।
এভাবেই এসএসসি পেরিয়ে গত বছর শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দেন। উত্তীর্ণ হয়েছেন জিপিএ ২ দশমিক ৫ পেয়ে। এখন তিনি ডিগ্রিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন তার। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আবারও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অর্থের সংকট। ভর্তি, বই কেনা ও যাতায়াত খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই পরিবারের।
‘জন্ম থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। হাঁটতে পারি না। চলাচল করতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে। এভাবেই কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু বই কেনার মতো সামর্থ্য নেই আমার’— বললেন মনা।
তারপরও স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি তিনি। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চান। মনার এ স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি ছোট্ট চাওয়া— সহজে চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা। তার ভাষায়, একটি অটোরিকশা থাকলে যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমত। নিজের জন্য চলাচলের একটি সহজ ব্যবস্থা হলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও তার কাছে অনেকটা সহজ হয়ে উঠত।






