ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় ২১৭ শিশু ভর্তি

সংগৃহীত ছবি
ঠাকুরগাঁওয়ে আবহাওয়া পরিবর্তনসহ শীতজনিত রোগে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার) ২১৭ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে শিশুরোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। ঠাণ্ডা-গরমের পরিবর্তনশীল আবহাওয়া ও ভাইরাসজনিত কারণে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। ফলে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু হাসপাতালের বড় অবকাঠামোর আড়ালে রয়েছে নানা সংকট। শিশু ওয়ার্ডে শয্যাসংকট ছাড়াও রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহের ঘাটতি। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, নানা সংকটের পাশাপাশি অসুখে জর্জরিত হাসপাতালটিও।
আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে শয্যার পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীদের রাখা হয়েছে। এরপরও জায়গার সংকুলান না হওয়ায় কয়েক দিন ধরে হাসপাতালের গাছতলায় শিশুদের নিয়ে অবস্থান করছেন অভিভাবকরা। অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অসহনীয় পরিবেশ। রয়েছে ভ্যাপসা গরম, বিশুদ্ধ পানির সংকট ও অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার। অভিযোগ রয়েছে, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।
হাসপাতালের মূল ফটকের সামনের গাছগুলোর নিচে বিছানা পেতে শুয়ে-বসে আছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের পাশে অসুস্থ শিশু। হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে রেখেই শিশুদের চিকিৎসা করাচ্ছেন তারা। কারও শিশুর হাতে স্যালাইন চলছে, কেউ আবার অপেক্ষা করছেন চিকিৎসা কিংবা ওষুধ দেওয়ার জন্য।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার বলেন, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
পাশের জেলা পঞ্চগড়ের বিউটি বেগম তার ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। শিশুটি জন্ম থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। এবার টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। একটি বিছানায় দুই থেকে তিন শিশুকে রাখা হচ্ছে। শিশুরা কান্নাকাটি করে, ভেতরে থাকতে চায় না। তাই বেশিরভাগ সময় নাতিকে বাইরে খোলা বাতাসে রাখতে হয়। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শুধু ভেতরে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, রোগীর তুলনায় শৌচাগার কম। নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাওয়ার পানিরও সংকট রয়েছে। রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে গেলেও অনেক সময় সেটি ব্যবহার করা যায় না। তখন হোটেল থেকে পানি আনতে হয়।
পঞ্চগড়ের জগদল সর্দারপাড়ার হোসেন আলী তার অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, একটি বিছানায় দুই থেকে তিনজন রোগীকে রাখা হচ্ছে। ভেতরে শোয়ার তো দূরের কথা, বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। প্রচণ্ড গরম ও ভিড়ে শিশুরা থাকতে চায় না।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়পলাশবাড়ীর আবু বকর বলেছেন, তার শিশু জ্বরের কারণে দুদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। ওয়ার্ডে ফ্যান থাকলেও প্রচণ্ড গরমের কারণে শিশুটি কান্নাকাটি করে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফিরোজ জামান জুয়েল বলেছেন, সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শৌচাগার ও পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না পাওয়া এবং ক্যানুলা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেছেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য সুইপারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে কখনো কখনো প্রায় ২৫০ শিশু ভর্তি থাকে। শিশুদের সঙ্গে মা-বাবারাও থাকেন। ফলে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।



