গাইবান্ধায় আশাবাদী সন্ধ্যা

আগামীর সময়-এর গোল্ড ক্লাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ছবি: আগামীর সময়
গাইবান্ধা জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে ৮ জুনের বিকালটা যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। সোমবারের মিষ্টি রোদ জানালা গলে ভেতরে ঢুকছিল, আর আমি মঞ্চের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম এক আশ্চর্য দৃশ্য— সারি সারি বসে আছেন দেড় শতাধিক প্রবীণ নারী-পুরুষ। কারও চুলে পাক ধরেছে পুরো, কারও হাঁটু বাঁক মানছে না, কেউবা হুইলচেয়ারে। কিন্তু সবার চোখে একই অপেক্ষা। কিসের অপেক্ষা? শুধু কি একটি ক্লাবের উদ্বোধন দেখার? না।
ওই চোখগুলো বলছিল, ‘আমরা ভুলে যাই কিন্তু ভুলে যাওয়ার মানুষ নই। কেউ আমাদের কথা ভেবেছে— এই অনুভূতিটুকু পেতে কত দিন লেগে গেল।’
আগামীর সময়-এর গোল্ড ক্লাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এটি; সারা দেশের মধ্যে প্রথম জেলা হিসেবে গাইবান্ধায় এই সামাজিক উদ্যোগের সূচনা হলো। প্রবীণদের পাশে আমরা— এই স্লোগান বুকে ধারণ করে আমরা যখন জেলার শতবর্ষী প্রবীণ আলহাজ হাফেজ মো. নুরুল ইসলামকে মঞ্চে নিয়ে এলাম, তখন তার কাঁপা কাঁপা হাত দুটো দেখে বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে উঠল। উনি আস্তে করে বললেন, ‘আল্লাহ আপনাদের ওপর রহমত করুক।’
এই ছোট্ট দোয়াটুকু যেন পুরো মিলনায়তনকে এক পবিত্রতার আভায় উজ্জ্বল করে দিল। তার পাশে মঞ্চে উঠলেন আরও ৫০ জন প্রবীণ। আমরা একেক করে তাদের হাতে গোলাপ তুলে দিচ্ছিলাম আর দেখছিলাম, গোলাপের চেয়েও লাল হয়ে উঠছে তাদের চোখ মুখ গাল।
সারিতে বসা অন্য প্রবীণেরা হাততালি দিচ্ছিলেন, কেউ চোখ মুছছিলেন। কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, মনে হচ্ছিল যেন ভুলে যাওয়া এক প্রজন্ম আবার নিজেদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি পাচ্ছে।
আমরা কবে থেকে এমন হয়ে গেলাম? যে সমাজে বৃদ্ধ বটগাছের মতো ছায়া দেন, যে মায়ের কোল আমাদের প্রথম পাঠশালা, যে বাবার পিঠ ছিল জীবনের প্রথম ঘোড়া, তাদের আজ আমরা পুরনো খাতা মনে করে ধুলোয় ফেলে রাখি?
আমি ভাবছিলাম, আমরা কবে থেকে এমন হয়ে গেলাম? যে সমাজে বৃদ্ধ বটগাছের মতো ছায়া দেন, যে মায়ের কোল আমাদের প্রথম পাঠশালা, যে বাবার পিঠ ছিল জীবনের প্রথম ঘোড়া, তাদের আজ আমরা পুরনো খাতা মনে করে ধুলোয় ফেলে রাখি? একজন প্রবীণ পরে তার বক্তব্যে বললেন, ‘প্রবীণদের কথা বলতে গেলে কেউ ভাবে না। কিন্তু এই পত্রিকা সেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা বৃদ্ধাশ্রম বানাই, কিন্তু কেন এমন প্ল্যাটফর্ম বানাই না, যেখানে আমরা সসম্মানে মাথা উঁচু করে বলতে পারি, আমিও আছি, আমিও দরকারি?’
আমাদের সমাজের বৃদ্ধরা কোনোভাবেই ব্রাত্য নন। প্রথমত, তারা আমাদের ইতিহাসের ধারক। যারা এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য বিধেয়, এদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, ভাষা আন্দোলন দেখেছেন, বাংলাদেশের জন্মমুহূর্তটি দেখেছেন।
দ্বিতীয়ত, জীবন তাদের প্রত্যেককে অভিজ্ঞতায় জ্ঞানী করেছেন, প্রত্যেকে হয়ে উঠেছেন একেকজন জীবন্ত জ্ঞানভাণ্ডার। বর্ষীয়ান অধ্যাপক মুকুল যখন বললেন, ‘ওল্ড ইজ গোল্ড— এই নামকরণ যথার্থ হয়েছে,’ তখন বুঝলাম, এই নামটা তাদের আত্মপরিচয় হয়ে উঠেছে।




