এমপি পদ হারানো আসলাম চৌধুরী নেই হাইকমান্ডের ‘গুডবুকে’

আসলাম চৌধুরী
টানা আট বছর তিন মাস কারাগারে ছিলেন বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরী। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ১৫ দিন পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। নেতাকর্মীরা ভেবেছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড আসন থেকে নিশ্চিত মনোনয়ন পাচ্ছেন তিনি; কিন্তু মনোনয়ন ঘোষণার পর দেখা গেল সীতাকুণ্ডে বিএনপির পছন্দ একজন যুবদল নেতা।
এমন মনোনয়নে বিস্মিত নেতাকর্মীরা বুঝতে পারলেন, আসলাম চৌধুরী বোধহয় দলীয় হাইকমান্ডের গুডবুকে নেই। পরে অবশ্য যুবদল নেতা কাজী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে বাদ দিয়ে আসলামকে প্রার্থী করে বিএনপি। এতে তার গুডবুকে থাকা না থাকার বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। কিন্তু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়ে আইনি জটিলতায় নির্বাচিত হয়েও শপথ নিতে না পারা এবং সবশেষ আপিল বিভাগের রায়ে প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর ফের সামনে এলো ‘গুডবুক’ আলোচনা।
আসলাম চৌধুরীরও সন্দেহ, দলের ভেতর কেউ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে। রায় ঘোষণার পর তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘কেউ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন কি না, সেটা সবচেয়ে ভালো বুঝবেন আমার নেতা তারেক রহমান। তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আমিও আট বছর জেলে ছিলাম। এ সুযোগে কেউ তাকে ভুল বুঝিয়েছেন কি না, সেটা আমি জানি না।’
প্রার্থিতা বাতিলের জেরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আসলাম চৌধুরীর অনুসারী বিএনপি নেতাকর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে হাতে লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল নেতাকর্মী সীতাকুণ্ডের ছোট দারোগারহাট ও আশপাশের এলাকায় মহাসড়কের বেশ কিছু স্পটে অবস্থান নেন।
এ সময় তারা ‘দুর্দিনের আসলাম ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘এমপি পদ বাতিল হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’— এ ধরনের বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানালেন, নেতাকর্মীরা মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের ডালপালা কেটে রেখে এবং গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে মারাত্মক যানজটের সৃষ্টি হয়, ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। ঘটনাস্থলে পুলিশ অবস্থান নিলেও বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করতে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না, দাবি স্থানীয়দের।
বেলা ৩টা থেকে বিকাল ৫টার মধ্যে মহাসড়কের অসংখ্য স্পটে অবরোধ থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে বলে জানালেন পুলিশ কর্মকর্তারা। পরে বৃষ্টি শুরু হলে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা মহাসড়ক ছাড়েন।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ব্যবসায়ী আসলাম চৌধুরী ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৪-১৬ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য, সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০২৪ সালের ১৫ জুন তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হয়। ২০০৮-১৮ ও সর্বশেষ ২০২৬ সালে তিন দফায় তিনি চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড ও নগরীর একাংশ) আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।
রাজনীতির শুরু থেকেই আসলাম চৌধুরী ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুনজরে। এ কারণে দীর্ঘ সময় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও আলাদা গুরুত্ব ছিল তার।
খালেদা জিয়ার গুডবুকে থাকাটাই তার ‘কাল’ হলো কি না, সেটাই এখন ভাবছেন আসলাম চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘এটা সত্য যে, দেশনেত্রী ব্যক্তিগতভাবে আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। ওনার পছন্দের কারণে কেউ আমাকে অপছন্দ করে থাকলে সেটা ভিন্ন বিষয়।’
২০১৬ সালে ইসরায়েলের প্রভাবশালী লিকুদ পার্টির সদস্য মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে আসলামের একটি ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়, যা বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করে। ওই বছরের ১৫ মে ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোড থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ‘এজেন্টের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামিও হন তিনি।
আসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে ৭৬টি মামলা করা হয়েছিল। সব মামলায় জামিন পেয়ে তিনি ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্ত হন।
কারামুক্তির পর আসলাম চৌধুরী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরেই ছিলেন। দেশে নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর আগপর্যন্ত প্রায় দেড় বছর তিনি দলীয় কোনো কর্মসূচিতেও অংশ নেননি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে ‘রহস্যময়’ একটি পোস্টার চট্টগ্রামের বিভিন্ন দেয়ালে সাঁটানো হয়। পোস্টারে স্বাধীনতা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অধিকার পূরণের অঙ্গীকারে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ‘শিগগিরই আসছি আপনাদের মাঝে’ পোস্টারে লেখা এমন বক্তব্য নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়।
এরপর থেকেই আসলামের সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব সৃষ্টির বিষয়টি নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচিত হতে থাকে। লন্ডনে গিয়ে তিনি তারেক রহমানের সাক্ষাৎ পাননি, এমন গুঞ্জনও শোনা যায়।
আসলামের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, জামিনে মুক্তির পর আসলাম চৌধুরীর মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখতে পান তারা। রাজনীতিতে অদৃশ্য প্রভাব রাখে প্রশাসনের এমন মহলের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহী এমন কয়েকটি দেশের দূতাবাসে নিয়মিত আসা-যাওয়াও শুরু করেন তিনি। ‘এমনও শুনেছি কোনো কোনো মহল থেকে ওনাকে (আসলাম) বলা হয়, আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেছে। বিএনপিকে শেষ করে দেওয়া হবে। তারেক রহমানকে ফিরতে দেওয়া হবে না। দেশে তৃতীয় শক্তির উত্থান হবে। সেই শক্তির শীর্ষ নেতা কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন তাকে দেখানো হয়। এতে ওনার মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস জন্মে যে, ইলেকশন হলেই তিনি পাস করবেন’— বলছিলেন আসলামের অনুসারী এক যুবদল নেতা।
বিএনপির সঙ্গে যুক্ত এক পেশাজীবী বললেন, ‘নির্বাচনের অন্তত মাসছয়েক আগে হাইকমান্ড থেকে ওনার (আসলাম) কাছে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে পাঠানো হয়। তারা নির্বাচন নিয়ে ওনার মনোভাব জানতে চান। পরে হাইকমান্ডের কানে পৌঁছানো হয়, তিনি তাচ্ছিল্য করে কিছু কথা বলেছেন। এতে মোটামুটি আসলামের মনোনয়ন অনিশ্চিত হয়ে যায়। প্রথমে মনোনয়নবঞ্চিতও হন। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নিশ্চিত বুঝতে পেরে আসলাম চৌধুরী দ্রুত নিজের অবস্থান পাল্টে ফেলেন। চট্টগ্রামের নীতিনির্ধারক এক নেতার মাধ্যমে লবিং করে শেষপর্যন্ত মনোনয়ন আদায়ে সক্ষম হন।’
ওই পেশাজীবীর মতে, নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে মনোনয়ন আদায় করতে পারলেও হাইকমান্ডের গুডবুকে আর ফিরতে পারেননি।
তৃতীয় শক্তির উত্থানের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা প্রসঙ্গে আসলামের ভাষ্য, ‘টোটালি রিউমার। কোনো সত্যতা নেই। এসব রিউমার আমার বিরুদ্ধে দলের ভেতরে ছড়ানো হয়েছিল। এসব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী বিজয়ী হয়েছিলেন; কিন্তু একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ঋণখেলাপি-সংক্রান্তে উচ্চ আদালতে তার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেছিলেন। আপিল চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষমাণ থাকায় আদালতের নির্দেশে আসলামের ফল প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়। গতকাল আপিল মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ আসলামের প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করেন।




