শুল্ক ফাঁকির কত ছল!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আস্ত গাড়ি আমদানি করলে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের শুল্ককর। তাই শুল্ক ফাঁকি দিতে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে নেওয়া হচ্ছে নানা কৌশল। কখনো গাড়ির বদলে দেখানো হচ্ছে আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ, আবার কখনো আস্ত গাড়িকে কয়েকটি বড় অংশে কেটে দেশে আনা হচ্ছে ‘ইউজড কার পার্টস’ বা ‘সেমি নকড ডাউন’ (এসকেডি) হিসেবে। পরে স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি।
এমন কৌশলে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে সম্প্রতি কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। এর মধ্যে কক্সবাজার থেকে জব্দ করা হয়েছে টয়োটা সুপরা, হোন্ডা সিভিক ও মাজদা সিএক্স-৫; আর চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ থেকে আটক করা হয়েছে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি। গাড়িগুলোর আমদানি, শুল্ককর পরিশোধ, মালিকানা ও স্থানীয়ভাবে সংযোজনের বৈধতা খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি।
পার্টসের আড়ালে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি আমদানির অভিযোগ
গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারের কলাতলী রোডের ওশেন প্যারাডাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করে সিআইআইডির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের একটি দল।
জব্দ করা গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে টয়োটা সুপরা, হোন্ডা সিভিক ও মাজদা সিএক্স-৫। অভিযানের সময় গাড়িগুলোর প্রচলিত নাম্বার প্লেটের পরিবর্তে ‘SINH4’, ‘S4FIAT’ ও ‘ESH4H’ লেখা থাকার বিষয়টি নজরে আসে কর্মকর্তাদের। পরে নেওয়া হয় গাড়িগুলোর আমদানি, মালিকানা, শুল্ককর পরিশোধ এবং স্থানীয়ভাবে সংযোজনের বৈধতা যাচাইয়ের উদ্যোগ।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাড়িগুলোর সঙ্গে পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনের নাম। তারা হলেন কক্সবাজারের হাসিবুর রহমান সিনহা, গাজীপুরের আজমাইন রাইহান, ঢাকার নকিবুল হাসান, গাজীপুরের শরাফাত রহমান ও ঢাকার সিফিয়াত মাহমুদ।
জব্দ করা গাড়িগুলোর বিল অব এন্ট্রি, আমদানি ঘোষণা, এইচএস কোড, ঘোষিত মূল্য, শুল্ককর পরিশোধের তথ্য, ভিআইএন/চেসিস নাম্বার, আমদানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে সিআইআইডি।
গাড়িগুলোর বিভিন্ন অংশ কীভাবে দেশে এসেছে, কোন পণ্যের নামে সেগুলো আমদানি করা হয়েছে এবং পরে কোথায় ও কীভাবে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ দেওয়া হয়েছে, এসব বিষয়ও থাকবে তদন্তের আওতায়।
জব্দ করা তিনটি গাড়ির ক্ষেত্রেও পূর্ণাঙ্গ গাড়ি আমদানি না দেখিয়ে আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ আমদানি করে শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্ত করছে সিআইআইডি। তদন্তে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণিত হলে কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আস্ত গাড়ি কেটে পার্টস!
শুল্ক ফাঁকির এমনই আরেকটি ঘটনা দাখা যায় চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযান চালিয়ে রহমতগঞ্জের সাত্তার মঞ্জিলের (বিটিআই ভবন) পার্কিং থেকে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি আটক করেছে সিআইআইডি। গাড়িটি চলাচল করত চট্টগ্রাম বিআরটিএর চট্ট মেট্রো-গ-১১-৩৬৫১ নম্বরে। সিআইআইডির কর্মকর্তাদের ধারণা, গাড়িটির আনুমানিক মূল্য আড়াই কোটি থেকে তিন কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ। বলছিলেন, মোংলা বন্দর দিয়ে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে সম্পূর্ণ বিলাসবহুল গাড়ি তিন-চারটি বড় অংশে কেটে ‘সেমি নকড ডাউন’ (এসকেডি) অবস্থায় আমদানির একটি কৌশল শনাক্ত করেছে সিআইআইডি। এভাবে প্রকৃত আমদানি পণ্য আড়াল করে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে রহমতগঞ্জের একটি পার্কিং থেকে বিএমডব্লিউ গাড়িটি শনাক্ত করে আটক করা হয়।
কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গাড়িটির বর্তমান মালিক মোহাম্মদ আইয়ুবের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, দেশের বাইরে রয়েছেন তিনি। পরে তার স্ত্রী সুলতানা ফারহানা জাহানের কাছে গাড়ি কেনা ও আমদানি-সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র দেখতে চান কর্মকর্তারা। তবে কোনো নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি।
এ সময় গাড়িটির চাবি চাওয়া হলে সংশ্লিষ্টরা চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান— অভিযোগ রেজভী আহম্মেদের। পরে গাড়ি আমদানির বৈধ দলিল, ক্রয়-সংক্রান্ত কাগজপত্র কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে না পারায় আটক করা হয় গাড়িটি।
সিআইআইডির অতিরিক্ত মহাপরিচালকের ভাষ্য, শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা, ভিন্ন পদ্ধতিতে চোরাচালান কিংবা দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে বিএমডব্লিউ গাড়িটি দেশে আনা হয়েছে কি না, তা জানতে চলছে বিস্তারিত অনুসন্ধান।







