হুতি হামলা সৌদিতে আঘাত বাংলাদেশে
- ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর জনশক্তি রপ্তানি নেমেছে অর্ধেকে
- যুদ্ধের পাশাপাশি আইনের কড়াকড়ি
- কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ
- বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার পরামর্শ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। লাখো মানুষের স্বপ্নের গন্তব্য। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। হুতিদের টানা হামলায় দেশটি এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ভূমি। ভয় ঢুকেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনেও। নতুন কর্মীদের যাওয়ার হারও কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। সব মিলিয়ে সৌদির শ্রমবাজারে নেমেছে ধস।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যানে এই ধসের চিত্র স্পষ্ট, বেশ ভয়াবহ। চলতি মাসের ১১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরব যেতে সরকারি ছাড়পত্র (বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স) পেয়েছেন মাত্র ৮ হাজার ৭০০ জন কর্মী। দিনে গড়ে কর্মী গেছেন ৭২৫ জন। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই গেছেন সাড়ে ৬৫ হাজার। দিনে গড়ে ২ হাজার ১১০ জন। আর ২০২৫ সালে দিনে গড়ে কর্মী গিয়েছিলেন ২ হাজার ৬২ জন। বিষয়টি এমন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের সর্বনিম্ন কর্মী পাঠানোর তালিকায় ঠাঁই নেবে এই অক্টোবর। জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত শুধু সৌদি আরবে কর্মী গেছেন প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার। বছরের বাকি নভেম্বর ও ডিসেম্বর। এ দুই মাসে পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি না হলে বছর শেষে এই সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজারে আটকে যাবে। অথচ ২০২৫ সালেই শুধু সৌদি আরবে কর্মী গিয়েছিলেন ৭ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি।
কর্মীদের সৌদিযাত্রা কমলে বছর শেষে মোট প্রবাসে কর্মসংস্থানেও ধস নামবে। ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩২ হাজার কর্মী চাকরি নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। এই ধারায় নাটকীয় কোনো উন্নতি না হলে বছর শেষে ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা সাড়ে সাত লাখ ছাড়াবে না।
১১ অক্টোবর থেকে ভিসা জটিলতায় যারা আটকা পড়েছেন, তাদের ভিসা নবায়ন বা নতুন ভিসার বিষয়ে জানতে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে ডেকেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘প্রবাসী কর্মীদের ভিসা নবায়ন আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এজন্য ২৬ অক্টোবর তাদের সঙ্গে বসব। একই সঙ্গে নতুন কর্মীদের কী হবে, তাও আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। হামলা-অস্থিরতা শেষে কীভাবে তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে কথা বলব। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।’
এখন প্রশ্ন হলো, কর্মী যাওয়া কমার মূল কারণ কী। এটি কি শুধুই হুতিদের হামলা, নাকি সৌদি সরকারের নতুন নিয়মের কড়াকড়ি? প্রবাসে কর্মসংস্থান প্রক্রিয়ায় জড়িত এজেন্সিদের সংগঠন বায়রার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবু জাফর বলছেন, ‘দুটি কারণই এর জন্য দায়ী। তবে মূল কারণ সৌদির নতুন আইনের কড়াকড়ি। সৌদি সরকার এখন আর আগের মতো অদক্ষ কর্মী নিতে আগ্রহী নয়। তারা আকামার (কাজের অনুমতিপত্র) ফি বাড়িয়েছে। ২৩টির বেশি পেশায় ‘তাকামুল’ দক্ষতা সনদ বাধ্যতামূলক করা, ৬৯টি পেশায় কঠোর ‘সৌদিকরণ’ এবং ‘কিওয়া’ পোর্টালের মাধ্যমে ফ্রি ভিসা বন্ধ করে দেওয়ায় অদক্ষ কর্মীদের পথ আগে থেকেই সরু হয়ে গিয়েছিল। এখন নতুন করে যোগ হয়েছে হুতিদের হামলা।’
বিমানবন্দরে হামলা হলেও সংকট ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। রিয়াদসহ সৌদি আরবের প্রধান শহরগুলোয় বসবাসকারী প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশির মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী রিয়াদের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রবাসীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। রিয়াদের শিল্পাঞ্চল সানাইয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি প্রকৌশলী ফুয়াদ হাসান জানালেন, হামলার পর বিমানবন্দর ও আশপাশে নিরাপত্তা বাড়ানো হলেও উদ্বেগ কাটেনি। বড় প্রকল্পে কাজের গতি কমে গেছে। নতুন শ্রমিক নিয়োগ স্থগিতের নির্দেশনা এসেছে কোম্পানি থেকে। আতঙ্কে অনেক কর্মী দেশে ফিরতে চাইছেন। নতুন কর্মীরাও কাজে যোগ দিতে ভয় পাচ্ছেন।
এভাবে চলতে থাকলে কী হবে? এমন প্রশ্ন এখন সবার মনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এই গতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারে ভয়াবহ ধস নামবে। ২০২৫ সালে আমাদের জনশক্তি রপ্তানির ৭০ শতাংশই গেছে সৌদি আরব। যার পরিমাণ সাড়ে সাত লাখ। কিন্তু আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই ধারা পরিবর্তন না হলে বাজারটি স্থবির হয়ে পড়বে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে জনশক্তি রপ্তানির বড় বাজার মারাত্মক সংকটে পড়বে।
নাম প্রকাশ না করে এক বায়রা নেতা বললেন, ‘সরকার যদি অবিলম্বে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসা ও আকামার মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ না নেয়, তবে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে, দেশের অর্থনীতিতে।’
শ্রমবাজারে ধস নামার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় অংশটি আসে সৌদি থেকে। ২০২৬ সালের শেষে গিয়ে যদি সৌদি আরবে কর্মী যাওয়া সত্যিই অর্ধেকে নেমে আসে, তবে রেমিট্যান্সে বড় ধরনের ধস নামবে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, এর ফলে বছরে অন্তত ৬ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধাক্কা লাগবে।
হামলার কারণে সৌদি আরবের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সৌদি আরবের মেগা প্রকল্প ‘ভিশন ২০৩০’ ঘিরে বিপুল বাংলাদেশির কাজের সুযোগ ছিল। এ কারণে এত বিপুল কর্মী বাংলাদেশ থেকে সৌদিতে যাচ্ছে। হামলার কারণে এসব প্রকল্পে কাজের গতি কমেছে। বহুল আলোচিত নিওম সিটি ও রেড সি প্রজেক্টের মতো মেগা প্রকল্পগুলোয় নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ায় এবং লোহিতসাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাজেট সংকোচন করেছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেক বিদেশি কোম্পানি কাজ গুটিয়ে নিচ্ছে। নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে সেবা খাতে কাজের সুযোগ কমেছে। আর এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরা।
বিশ্লেষকরা বেশ কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। প্রথমত, শুধু সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজতে হবে। ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার নতুন দেশে কর্মী পাঠাতে হবে। দ্বিতীয়ত, অদক্ষ কর্মী পাঠানোর দিন শেষ। যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে পাঠাতে হবে। কারণ, নিয়মের কড়াকড়ির মধ্যেও দক্ষ কর্মীর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তৃতীয়ত, যেসব বাংলাদেশি কর্মী বর্তমানে সৌদিতে অবস্থান করছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ দূতাবাসকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে কর্মীদের মনে ভরসা ফেরাতে হবে। তবেই এ সংকট মেটানো সম্ভব।



