৩৭ কোটি এককালীন বিনিয়োগে বছরে আয় ১৪ কোটি টাকা!
- ৮টি ইপিজেডে কর্মরত ৫ লাখ ৬০ হাজার কর্মী
- বিদেশি বিনিয়োগ ৯৩ হাজার কোটি টাকা
- ঢাকা-চট্টগ্রাম ইপিজেডে কোনো প্লট খালি নেই
- গত বছর রপ্তানি আয় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি

শিল্পাঞ্চলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের আটটি ইপিজেড অর্থনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) ইপিজেডগুলোয় প্রতি একর জমিতে গড়ে বিনিয়োগ সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা। এই ১ একর জমি থেকেই প্রতি বছর আয় করে গড়ে ১৪ কোটি টাকা। শিল্পাঞ্চলের এমন অভূতপূর্ব সাফল্য বাংলাদেশের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যেমন অনুকরণীয় হয়েছে, তেমনি এই উদাহরণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
বেপজার অধীন আটটি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারীরা ৭ হাজার ৪৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রতি ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে) বা ৯৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ১৯৮০ সাল থেকে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৬ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। বেপজা জোনগুলো থেকে এককভাবে আসে দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ। মোট বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের (এফডিআই) ১৯ শতাংশ এনেছে এই বেপজা। এসব ইপিজেডে ৫ লাখ ৬০ হাজার কর্মী সরাসরি কাজ করেন।
বেপজার অনন্য এই উদাহরণের তথ্য জানা গেছে গতকাল শনিবার। চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লু হোটেলে এই অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের নিয়ে ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেপজা। যেখানে প্রায় দেড়শ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী উপস্থিত ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ তানভীর হোসেন এক উপস্থাপনায় বেপজার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ও অগ্রগতি তুলে ধরতে গিয়ে এ সাফল্যের কথা জানিয়েছেন।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার পারভেজ জানালেন, চালু থাকা আটটি ইপিজেডে অপারেশনাল বা ব্যবহারযোগ্য জমি ২ হাজার ৪০৩ একর। প্রতি একর জমি থেকে গড়ে ৩ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৩৭ কোটি টাকার মূলধনি বিনিয়োগ এসেছে। এসব ইপিজেড থেকে বার্ষিক পণ্য রপ্তানি, শ্রমিকদের বেতন, সরকারকে দেওয়া ভ্যাট-ট্যাক্স ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসাব করলে একরপ্রতি রিটার্ন প্রায় ১৪ কোটি টাকা। সীমিত ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে বেপজা প্রতি একর জমিতে এই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্প খাতের প্রেক্ষাপটে জমিভিত্তিক বিনিয়োগের এই রিটার্ন এককথায় অনন্য ও নজিরবিহীন। দেশের সাধারণ শিল্পাঞ্চল কিংবা বিসিক নগরীগুলোয় জমি বরাদ্দের পর দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বা ধীরগতির উৎপাদনের চিত্র প্রায়ই দেখা যায়। অনেক স্থানে হাজার একর জমিতেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসে না। সেখানে বেপজা বহুতল কারখানা ভবন নির্মাণ, আধুনিক অবকাঠামো এবং সমন্বিত পরিষেবা নিশ্চিত করেছে। ফলে তারা প্রতি ইঞ্চি জমির দক্ষ ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
দেশের সবচেয়ে বড় চট্টগ্রাম ও ঢাকা ইপিজেডে এখন কোনো প্লট খালি না থাকাই এর বড় প্রমাণ। চট্টগ্রামে এশিয়ান গ্রুপের ১৬টির বেশি কারখানা ও ইউনিটে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। এই গ্রুপে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান। তাদের চট্টগ্রাম ইপিজেডেও সি-টেক্স লিমিটেড নিট কারখানা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম বললেন, ‘সহজ প্রশাসনিক সেবা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, শুল্কমুক্ত সুবিধা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণেই অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেপজার ইপিজেডগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।’
অল্প জমিতে বিশ্বমানের কারখানা গড়ে ওঠায় লাখ লাখ সাধারণ বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে গড়ে উঠছে দক্ষ মানবসম্পদও। সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেমন শক্তিশালী হচ্ছে, তেমনি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভাবমূর্তিও অনেক গুণ বাড়ছে। বিশ্ববাজারের বর্তমান মন্দা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বেপজা তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এতে করোনা মহামারীতেও দেশের অর্থনীতিতে ধস নামেনি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজা থেকে সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৫ হাজার ১২৫ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আরও ৩৬টি নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যেখানে বিনিয়োগ আড়াই হাজার কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম ও ঢাকা ইপিজেড ছাড়া বাকি ছয়টি হলো— মোংলা, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা, উত্তরা, আদমজী ও কর্ণফুলী।



