চট্টগ্রাম বোর্ডে ৬২ হাজার শিক্ষার্থী গণিত-ইংরেজিতে ফেল

ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে শুধু ইংরেজি ও গণিতেই ফেল করেছে ৬১ হাজার ৬৫৯ জন, যা এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর ৪৭ শতাংশ। ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলাফলেও। এবার বোর্ডে পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। যেটি চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
পরীক্ষকরা বলছেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোরতার কারণে ফলাফলে প্রভাব পড়েছে। অবশ্য শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক অপ্রতুল। যার কারণে ইংরেজি ও গণিতের মতো মূল বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইং পরিচালিত গবেষণায়ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণাটি চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত হয়।
ইংরেজি ও গণিতে সবচেয়ে খারাপ ফল: ২০২৫ ও ২০২৬ সালের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে ইংরেজিতে। ২০২৫ সালে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বড় ব্যবধানে কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ২৭ শতাংশে। এবার এ বিষয়ে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৬৬ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ৯৩ হাজার ৪৯০ জন। ফলে শুধু ইংরেজিতেই ফেল করেছে ৩৫ হাজার ৮৭৬ জন।
গণিতেও কমেছে পাসের হার। ২০২৫ সালে গণিতে পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে কমে দাঁড়ায় ৮০ শতাংশ। চলতি বছর গণিতে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৫ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ১ লাখ ৩ হাজার ৪৫২ জন। অর্থাৎ অকৃতকার্য ২৫ হাজার ৭৮৩ জন।
বিজ্ঞানের কিছু আবশ্যিক বিষয় ও উচ্চতর গণিতেও গত বছরের তুলনায় পাসের হার কিছুটা কমেছে। মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের অন্যান্য নৈর্বাচনিক বিষয়ে পাসের হার ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশের ওপরে আছে। তবে আইসিটিতে পাসের হার রেকর্ড ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে পাসের হার ৯৯ শতাংশ এবং গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে বেড়ে ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
জাতীয় মূল্যায়নেও ইংরেজি-গণিতে পিছিয়ে শিক্ষার্থীরা: শুধু চট্টগ্রাম বোর্ড নয়, সারা দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত একটি জাতীয় মূল্যায়নেও ইংরেজি ও গণিতে পিছিয়ে পড়ার তথ্য উঠে এসেছে। ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস ২০২৩’ শীর্ষক এই মূল্যায়ন কার্যক্রম সারা দেশের এক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত হয়। সেখানে দেখা যায়, গণিতের উদ্বেগজনক চিত্র। অষ্টম শ্রেণিতে গণিতের গড় স্কোর ২০১৫ সালের ৩৯৬ থেকে কমে ৩৯২। দশম শ্রেণিতে গণিতের স্কোর ২০১৯ সালের ৪৫৮ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৪২৫ দাঁড়িয়েছে। ইংরেজিতেও পিছিয়েছে। অষ্টম শ্রেণিতে ইংরেজির স্কোর ২০১৯ সালের ৩৮৯ থেকে কমে হয়েছে ৩৭৯।
শুধু অষ্টম শ্রেণির জন্য পরিচালিত বিজ্ঞান বিষয়ে মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা গড়ে মাত্র ৩২ শতাংশ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পেরেছে। অর্থাৎ পাঠ্যক্রমের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আয়ত্ত করতে পেরেছে তারা।
যা বলছেন শিক্ষকরা: চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল আমিন বললেন, ‘বর্তমানে বোর্ড থেকে শিক্ষকদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী ঠিক যতটুকু নম্বর পাওয়ার যোগ্য, তাকে ততটুকুই দিতে হবে। নম্বর বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আগে ২৮ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ৩৩ দিয়ে পাস করানোর যে চর্চা ছিল, গত দুই বছরে তা বন্ধ হয়ে গেছে।’
একটি স্কুলের এসএসসির গণিত খাতা মূল্যায়নকারী এক শিক্ষক জানালেন, আগে বোর্ড থেকে বলা হতো, ফেল করালে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ছেড়ে দেবে, তাই পাস করিয়ে দেওয়াই ভালো। এখন আর সে নির্দেশনা নেই।
পুরনো অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আজিজুল হক নিজামী বলছিলেন, ‘বিগত সময়ে বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নির্দেশ আসত, ঢাকা বোর্ড প্রথম হলে চট্টগ্রাম কেন দ্বিতীয় হবে না। একবার খাতা কাটার পর আমার বান্ডিলে ১৫ জন শিক্ষার্থী ফেল করে, এজন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হয়েছিল। তখন বলেছিলাম, আমি আর পারছি না, আপনারা পারলে পাস করিয়ে দেন। বর্তমান ফলই মূলত প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে।’
চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেছেন, ‘আমি তখন ছিলাম না, সে বিষয়ে আমার ধারণা নেই। তবে এবারের কথা বলতে পারি, এবার যে শিক্ষার্থী যতটুকু লিখেছে, সে ঠিক ততটুকুই নম্বর পেয়েছে।’
আগে শিক্ষকরা বেশ উদারভাবে নম্বর দিতেন— বললেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আবুল মোমেন। তিনি বলছিলেন, ‘এখন এতে পরিবর্তন এসেছে। খাতা কাটায় উদারতা দেখানো বন্ধ হয়েছে। এই ধারা বজায় থাকলে ধীরে ধীরে প্রকৃত ফলাফল বেরিয়ে আসবে।’ ইংরেজি ও গণিতে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বললেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ভালো ইংরেজি শিক্ষকরা অল্প বেতনে থাকতে চান না। অন্য ভালো চাকরি পেলেই চলে যান।’




