আজ মেলা, কাল জব্বারের বলীখেলা

ছবি: আগামীর সময়
কালিয়াকৈরের নীতিশ পাল। বাপ-দাদার হাত ধরে কুমার পেশায়। টিকিয়ে রেখেছেন ঐতিহ্য। আয় রোজগার তো বটেই, এই ব্যবসায় একটা মাটির টানও যেন নীতিশের। প্রতি বারের মতো এবারও জব্বারের বলীখেলা ষাটোর্ধ্ব এই কুমারকে টেনে এনেছে বীর চট্টগ্রামে। কাটা পাহাড়ের পাশে শুক্রবার সকালে ব্যস্ত দিনের শুরু। ট্রাক থেকে একে একে নামছে মাটির ব্যাংক।
এভাবে দূর দূরান্তের হাজারো ব্যবসায়ীর গন্তব্য লালদীঘির মাঠ ও আশপাশ। কত শত পণ্যের সমাহার। কোলাহলে ভরপুর আনাচ কানাচ। এ যেমন আন্দরকিল্লা পুরোনো সিটি করপোরেশন ভবনের কাছাকাছি হলেই চোখ পড়বে সারি সারি ঝাড়ু। ভিড় ঠেলে এগোলে পাপোশ, খেলনা বাটি, ফুল ফল আরো কত কী। বসেছে মেলা। আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলার মেলা।
আজ শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু। তবে বেচাকেনা চলছে বুধবার থেকে। কাল শনিবার বিকেলে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলা। শতবর্ষী এই বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা এবার পা রেখেছে ১১৭ বছরে। এসএসসি পরীক্ষার কারণে মেলার ব্যাপ্তি তিন থেকে কমে হয়েছে দু’দিন। এ কারণেই কিনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আগেভাগে জিনিসপত্র বিক্রির একটা তাড়া।
ব্যবসা না হয় কিছু একটা হবে, কিন্তু এই মেলার সঙ্গে যেন কিছু কিছু লোকের নাড়ির বন্ধন। সিলেটের শীতল পাটি নিয়ে আসা গৌর চাঁদ দাশের কথায় ধরুন। জায়গা পেয়েছেন মহল মার্কেটের পেছনের গলিতে। তার মুখে শোনা যাক, ‘ছোটবেলা থেকে আসছি এই মেলায়। এক নম্বর শীতল পাটি নিজ হাতে তৈরি করে আনি। এটাতে আসার জন্য মুখিয়ে থাকি প্রতিবছর।’
মহল মার্কেটের সামনে তো দা কুন্তি, তামা পিতল, সিলভারের বিশাল সম্ভার। আরেকটু এগিয়ে যান। লালদীঘি পেট্রল পাম্প চত্বরপুরোটায় গৃহসজ্জ্বা, হাঁড়ি পাতিল, আয়না, খেলনায় ভরপুর। দু তিনদিন এই পাম্পে গাড়ি ঢুকবে না। সামনের জেলা পরিষদ চত্বর ও সড়কজুড়ে রান্নাবাটি, মাটির তৈজসপত্র, শোপিস, কাঠের সামগ্রী।
এবার চলে যেতে পারেন কোতোয়ালির দিকে। যেতে যেতে ফুটপাত ও সড়কে চোখে পড়বে রেশমি চুড়ি, প্রসাধনী, খেলনা, খাবার আরও কতশত রকমারি সামগ্রী। কোতোয়ালি মোড় পেরিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা নিউমার্কেটের কাছাকাছি জিপিও কার্যালয় পর্যন্ত মেলার ব্যাপ্তি।
মেলার একপাশ তো গেল। এবার লালদীঘির চার পাড় দেখা যাক। পূর্বপাড়ে সারি সারি ফুল ফলসহ নানা জাতের গাছের চারা বিক্রি করছে বিভিন্ন নার্সারী। রয়েছে ক্যাকটাসও। অন্য পাড়গুলো খাবার দোকানের দখলে। খাবার দোকান মানে গ্রামীণ মেলার প্রধান অনুসঙ্গ গজা, বুট বাদাম, খই ইত্যাদি। জেল রোডটি পুরোপুরি দখল করেছে ঝাড়ু আর বেতের তৈরি মোড়া, মাছের ফাঁদ, কূলা, পিঁড়ি আরো কত কী!
কে সি দে সড়কে মিলবে মাটির ও প্লাস্টিকের গৃহসজ্জ্বার সামগ্রী, খেলনা, শীতল পাটি আর ঝাড়ু এবং হাতপাখা। হাত পাখা ও ঝাড়ু পুরো মেলাজুড়েই পাওয়া যাবে। শহীদ মিনার কিংবা সিনেমা প্যালেস এলাকাটিতে রয়েছে কাঠের আসবাবপত্র।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ নাগরদোলা কিন্তু লালদীঘি মাঠের একপাশে সর্বক্ষণ ঘুরছে, এ না হলে কি আর মেলা জমে। ওই মাঠেই প্রস্তুত হয়েছে বলীখেলার রিং, যেখানে কাল মুখোমুখি হবেন বলী বা কুস্তিগীরেরা। প্রায় শ খানেক বলী এবার অংশ নেবেন বলে আশা করছেন বলীখেলা ও মেলা কমিটির সভাপতি হাফিজুর রহমান।
খেলার রিং দেখে ফেরার সময় কাটা পাহাড় লেনে নীতিশবাবুর সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাত। মাটির ব্যাংক নামানোর কাজ তখন প্রায় শেষপর্যায়ে। ভেঙেছেও কিছু ব্যাংক। এই ব্যাংকে হয়তো জমা হবে কত কিশোর তরুণ তরুণীর ভবিষ্যৎ মেলার খরচ বা সঞ্চয়। মাটির ব্যাংকের বিনিময়ে নিজের ভবিষ্যৎটাও উজ্জ্বল করতে চান নীতিশ।

