ঈদের দিনে বাড়ি ফিরছে মাহি, বাবার কোলে লাশ হয়ে

শিশুদের আইসিইউর বাইরে অপেক্ষমান মো. রুবেল ও তার বোন শারমিন। ভেতরে তার ছেলে শাহদাত চিকিৎসাধীন। ছবি: প্রণব বল
ভোর হতে না হতেই কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙল বিশ্রামরত অভিভাবকদের। শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) এইমাত্র একজন শিশু মারা গেল। হামের উপসর্গে আক্রান্ত মাহি সংকটাপন্ন, চিকিৎসকরা আগেই জানিয়েছিলেন বাবা-মাকে। তবু প্রাণ মানে না। চিৎকার-চেঁচামেচি, আর্তনাদ। ঈদের দিনে ৬ বছরের ছেলের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুদের আইসিইউর বাইরের খোলা জায়গাটিতে অভিভাবকরা থাকেন সব ময়। ৮ নম্বর শিশু ওয়ার্ডটির ভেতরে রোগীর সংকুলান না হলে তখন খোলা স্থানটিতেও শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। আজ বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহার দিনে শুধু রয়েছেন অভিভাবকরা। তাদের প্রত্যেকের শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
চট্টগ্রামে সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫৫ জন হাম ও হাম উপসর্গের রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ১২ জন। তবে আক্রান্ত, ভর্তি হওয়া রোগী এবং মৃত্যু বেসরকারি হিসাবে কয়েক গুণ বেশি। চমেক হাসপাতালেই প্রতিদিন হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন থাকে গড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ জন। ১৫ আইসিইউর সবগুলোই ভর্তি।
কারও কারও শিশু সংকটাপন্ন। সন্তানের সুস্থতার কাছে ঈদ বড় নয়। ২০টি আইসিইউ শয্যায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিশু মারা যাচ্ছে। এখানে থাকতে থাকতে তাদের এসব সয়ে গেছে। তাই আজ ভোরে মাহির বাবা-মায়ের কান্নাও কারও কারও কাছে রুটিন ব্যাপার। আবার কারও কারও কাছে আশঙ্কার মেঘ।
এই যেমন মো. রুবেল কিংবা তার মা আলেয়া বেগমকে এটা অনেক দিন ধরে দেখতে হচ্ছে। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের রুবেলের ছেলে ৯ মাসের শাহাদাত ৯ এপ্রিল থেকে এখানে আছে। প্রথমে হাম ওয়ার্ডে, পরে আইসিইউতে। গার্মেন্টসকর্মী রুবেল জানান, প্রতিদিন আইসিইউতে বাচ্চা মারা যায়। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা একটা কথা বলেন, এখানে যেসব বাচ্চা থাকে, সবগুলো অবস্থাই খারাপ। আজ ভোরে ঘুম ভেঙেছে বাবা-মায়ের কান্নায়।
আলেয়া বেগম ও রুবেলকে গত রোজার ঈদও এই হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল। তখন তার ছেলের নিউমোনিয়া হয়েছিল। সেবার ৯ দিন থাকতে হয়েছিল। কিন্তু এবারের সংগ্রাম আরও দীর্ঘ। প্রতিদিন রুবেলের মা আলেয়া, স্ত্রী সুমি আকতার ও বোন শারমিন হাসপাতালে রাত্রিযাপন করেন।
‘আজ ঈদের দিনে মা একটু চট্টগ্রামে আত্মীয়ার বাসায় গেছেন। আমাদের ঈদ আর কী। অন্য সময়ে বাড়ি যেতাম সবাই। কোরবানি দিতাম না। কিন্তু সবাই মিলে ভালো রান্নাবান্না করে খেতাম। ছেলের জন্য তা এবার হলো না’— রুবেল বললেন।
ঈদের আনন্দের চেয়ে ছেলেকে সুস্থ করার পথে যে দেনার বোঝা হয়েছে, তাতেই উদ্বিগ্ন রুবেল। চট্টগ্রামে যে গার্মেন্টসে চাকরি করেন, সেখানে ৩০ হাজার টাকা, বাইরের আত্মীয়স্বজনের কাছে লাখের কাছাকাছি ধারদেনা তার। তবু সন্তানের সুস্থতা চান রুবেল।
আইসিইউর বাইরে কথা বলতে বলতে হাসপাতালের দুপুরের খাবার এলো। ঈদ উপলক্ষে আজ বিরিয়ানি, ছাগলের মাংস এবং মুরগি উঠেছে পাতে। রুবেলের পাশে ছিলেন তার বোন শারমিন। স্ত্রী সুমি ছেলের শয্যাপাশে। তিনজন ভাগ করে খাবার খাবেন।
তাদের পাশে মুন্নী আকতার এসেছেন নগরের কাটগড় থেকে। তাকেও সাড়ে তিন মাসের মেয়ে তাজিফার জন্য ঈদের দিনে হাসপাতালে কাটাতে হচ্ছে। দুপুরের খাবার খেতে খেতে মুন্নী জানান, বাড়িতে ভাগাভাগি করে কোরবানি হয়। এবার মন ভালো নেই। তারপরও ছেলেদের আবদারে ছোট একটি গরু কিনেছেন।
সপ্তাহখানেক ধরে হাসপাতালে থাকা মুন্নীর বুক কেঁপে ওঠে যখন কারও কান্না শোনেন। আজ সকালেও মাহির বাবা-মায়ের কান্না তার মন খারাপ করেছে। ঈদের আনন্দ এক পাশে রেখে মুন্নী বললেন, ‘আমি ছয় দিন ধরে এখানে পড়ে আছি। শুধু আশা, মেয়েটা ভালো হবে। তখন বাড়ি ফিরব আনন্দে।’






