বাদলের জাল বুনার বয়স এখন ৪৫ বছর!

জাল বুনছেন বাদল কান্তি দে
মেশিনে তৈরি জালের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে হাতে বোনা জাল। কমেছে চাহিদা, কমেছে বিক্রিও। তবু সুঁই-সুতো হাতে কাজ করে চলেছেন বাদল কান্তি দে। একটি জাল তৈরি করতে কখনো ৬ থেকে ৯ মাসও লেগে যায়। দীর্ঘ শ্রমের পর সেই জাল বিক্রি হয় ছয় থেকে ৭ হাজার টাকায়। অথচ এত পরিশ্রমের বিনিময়ে লাভ থাকে সামান্যই। তারপরও এই পেশা ছাড়েননি তিনি। কারণ, জাল বুনেই একসময় গড়েছেন সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন, দিয়েছেন মেয়েদের বিয়ে এবং ছেলের সংসারও সাজিয়েছেন।
লালদীঘির পশ্চিম পাড়ের নবগ্রহ বাড়ির প্রবেশদ্বারে দেয়ালে স্ট্যান্ড লাগিয়ে সেখানেই নানা রকমের জাল সাজিয়ে বসেছেন তিনি। ছোট এই দেয়ালটাই তার দোকান। এখানেই প্রতিদিন জাল বুনন ও মেরামতের কাজও করেন।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বাদল কান্তির গ্রামের বাড়ি। বললেন, ‘জাল বোনার শুরু ১৯৮১ সালে। শখের বশে হাতে নেওয়া কাজটি একসময় হয়ে ওঠে জীবিকার প্রধান অবলম্বন। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসবাস। সময়ের সঙ্গে এলাকায় গড়ে উঠেছে আধুনিক ও পাইকারি জালের দোকান। এসব দোকানে সহজেই মেলে মেশিনে তৈরি বিভিন্ন ধরনের জাল। তারপরও দূরদূরান্ত থেকে কিছু ক্রেতা আসেন। তাদের কাছে হাতে তৈরি জালের স্থায়িত্ব ও কাজের মানই বড় বিষয়।’
অন্য অনেক দোকানে পাইকারি বাজার থেকে আনা কিংবা মেশিনে তৈরি জাল বিক্রি করা হয়। কিন্তু বাদল নিজেই সুতো কেটে, জোড়া দিয়ে এবং ফিটিং করে জাল তৈরি করেন। প্রতিটি জালের পেছনে থাকে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, শ্রম ও আন্তরিকতা।
বাদল জানালেন, তৈরি জালের মধ্যে সবচেয়ে শ্রমসাধ্য বড় আকারের ‘ছুটকি জাল’। একটি জাল তৈরি করতে আকার বেঁধে সময় লাগে ৬ থেকে ৯ মাস। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিটি সুতোর গিঁট বেঁধে তৈরি করা জাল আকার ভেদে বিক্রি হয় ছয় থেকে ৯ হাজার টাকায়। এত দীর্ঘ শ্রমের পরও একটি জালে তার লাভ থাকে সর্বোচ্চ হাজার-বারো’শ টাকার মতো। অর্থাৎ মাসের পর মাস কাজ করেও শ্রমের তুলনায় আয় একেবারেই নগণ্য। তাও তিনি লেগে আছেন তার ভালোবাসার এই পেশায়।
একসময় এই পেশার আয় দিয়েই চলত বাদলের ৫ সদ্যস্যের সংসার। আক্ষেপ নিয়ে তিনি জানালেন, এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। মেশিনে তৈরি জাল কম সময়ে ও তুলনামূলক কম দামে বাজারে পাওয়া যায়। তাই হাতে তৈরি জালের ক্রেতা কমেছে। আগের মতো নিয়মিত বিক্রিও নেই। কোনো দিন এক-দুটি জাল বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন দোকানে ক্রেতাই আসেন না।
তবু থেমে নেই তার কাজ। জাল বোনা, পুরোনো জাল মেরামত এবং নতুন জাল বিক্রির মধ্য দিয়েই দিন পার করছেন তিনি। দীর্ঘ ৪৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত হিসাব করতে হচ্ছে শ্রম ও আয়ের।
যন্ত্রের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের অভ্যাস। সেই পরিবর্তনের চাপে পড়ছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল অনেক সৃজনশীল পেশা।



